২৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

কোন ফাঁদে ইসরায়েল,লেবাননের গভীরে ঢুকে

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১০-০৬-২০২৬
কোন ফাঁদে ইসরায়েল,লেবাননের গভীরে ঢুকে লেবাননের প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের সরকার ও গণমাধ্যম বেশ উচ্ছ্বসিত। কারণ, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের বেশ ভেতরে প্রবেশ করে প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে। [কালাত-আল-শাফিক নামে পরিচিত এই দুর্গটি ১২ শতকে ক্রসেডররা নির্মাণ করেছিল।]

গত রোববার সকালে ইসরায়েলি পত্রপত্রিকায় একটি মাত্র ছবিই যেন সবকিছু বলে দিচ্ছিল—দক্ষিণ লেবাননে বিউফোর্ট দুর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকার পাশাপাশি গোলানি ব্রিগেডের পতাকা উড়ছে। কিন্তু এই প্রতীকী দখলদারত্ব লেবানন অভিযানের কঠিন প্রশ্নগুলোকে ঢেকে রাখার এক প্রয়াস বলেই মনে হয়।

এই অভিযান থেকে এখন পর্যন্ত কৌশলগতভাবে কী অর্জিত হলো? অতীতের অভিযানগুলো থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে? এবং কীভাবে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার হুমকি ইসরায়েলি সেনাদের আহত করে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজায় কারও মন নেই বলেই প্রতীয়মান হয়।

 

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই আসলে অতীত থেকে কিছুই শেখেননি, আবার কিছুই ভোলেননি। তা না হলে ফাইবার অপটিক কেব্‌লের সহায়তায় পরিচালিত হিজবুল্লাহর ড্রোনগুলো ডজনে ডজনে কীভাবে প্রতিদিন ধেয়ে আসছে, তা জানার ও মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেত। উত্তর সীমান্তের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকায় তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই উত্থাপন করা হতো। এই সবকিছু বাদ দিয়ে আমরা এক ঐতিহাসিক দুর্গ দখলের রোমাঞ্চকর অভিযান নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি।

প্রায় কেউই এ পর্যন্ত যা ঘটেছে, এবং সর্বশেষ অভিযানে আমরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তা নিয়ে কোনো কথা বলছে না। এখনকার টেলিভিশন দর্শকদের অর্ধেকের বেশিই তো ১৯৮২ সালে জন্ম নেয়নি। সে কারণে তাদেরসহ সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ওই বছর বিউফোর্ট দুর্গ দখল করতে গিয়ে গোলানি ইউনিটের কমান্ডার মেজর গিয়োরা হারনিকসহ ছয়জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিল। এখনকার বেশির ভাগ টিভি দর্শকদের এটাও জানা নেই যে ’৯০–এর দশকে ইসরায়েলের দখলে থাকা নিরাপত্তা অঞ্চলে হিজবুল্লাহর পাতা বোমা কীভাবে আইডিএফের সাঁজোয়া যানগুলো উড়িয়ে দিয়েছিল।

 

কিন্তু মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সাংবাদিকেরা গত রোববার যেভাবে বিউফোর্ট দুর্গ দখল নিয়ে কথা বলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে এবার সবকিছু ভিন্ন রকম হবে এবং ক্রসেডারদের প্রাচীন এই দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহর সমস্যা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।

গণমাধ্যমে যে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে, তা দাঁড়িয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতার ওপর। উগ্র ধর্মীয় ডানপন্থীরা এখন কল্পনার জাল বুনছে যে দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে দেশটিতে ইসরায়েলের স্থায়ী দখলদারি শুরু হবে। অথচ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইসরায়েলের সরকার এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে।

আবার সেনাবাহিনী এক বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। কেননা, ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহকে নাস্তানাবুদ করার পরও তারা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রোববার সকালে সদম্ভে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী, প্রত্যয়ী ও একতাবদ্ধ হয়ে বিউফোর্টে ফিরে এসেছি।… এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আট হাজার হিজবুল্লাহ সন্ত্রাসীকে শেষ করে দিয়েছি, যার মধ্যে গত মাসেই শেষ করা হয়েছে ৭০০ জনকে।’ মন্ত্রীবর্গ ও সংসদ সদস্যরাও তোতা পাখির মতো নেতানিয়াহুর দাবি পুনরাবৃত্ত করে চলেছেন।

আর নেতানিয়াহু তো যুদ্ধের মূল্য নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন, তাঁর কাছে মুখ্য হলো সাফল্য অর্জন। সে কারণে লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রঘোষিত যুদ্ধবিরতি (যা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি) সত্ত্বেও ১৩ জন ইসরায়েলি নিহত হওয়ার সংখ্যা কোনো গুরুত্ব পায়নি, যেমন পায়নি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ইসরায়েলি নিহত হওয়া।

আইডিএফও এই অভিযানগত ও কৌশলগত ব্যর্থতায় জড়িত, যা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণের কাছে সর্বশক্তি দিয়ে এক সাফল্য হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করছেন। এটা ঠিক যে ২০২৪ সালে নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছিল, হিজবুল্লাহর সক্ষমতার বেশির ভাগটাই নস্যাৎ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু এবারের পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। হিজবুল্লাহ একটি সংগঠিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী সেনাবাহিনী হিসেবে কাজ করা বাদ দিয়ে তার শিকড় সেই গেরিলা সংগঠনে ফিরে গেছে। এর নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের নেতাদের স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। তারা এখন গ্যালিলি জয়ের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে। এর বদলে বেছে বেছে এমন সব দুর্বল এলাকা আঘাত হানার জন্য বেছে নিচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। লেবাননের গভীরে ইসরায়েলি সেনারা প্রবেশ করায় এই কৌশল জোরদার হয়েছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ