২৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সীমান্তে ‘পুশইন’: বৈঠকের টেবিলে সমঝোতা, মাঠে উত্তেজনা

অনলাইন প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৩-০৬-২০২৬
সীমান্তে ‘পুশইন’: বৈঠকের টেবিলে সমঝোতা, মাঠে উত্তেজনা সংগৃহীত ছবি

ভারতের নয়াদিল্লিতে চার দিনের বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে কয়েক ঘণ্টা আগে। যৌথ বিবৃতিতে সীমান্তে শান্তি, আস্থা ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। কিন্তু সম্মেলনের কালি শুকানোর আগেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ওই ১২ জন ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরের অংশে, শূন্যরেখার কাছাকাছি অবস্থান করছেন।

ঘটনাটি শুধু একটি সীমান্ত অনুপ্রবেশের চেষ্টা নয়; বরং এটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা এবং সীমান্তের বাস্তবতা কি একই পথে এগোচ্ছে?

 

বৈঠকের পরও কেন থামছে না পুশইন?

 

গত ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের সম্মেলনে সবচেয়ে স্পর্শকাতর আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি ছিল ‘পুশইন’। বৈঠকে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা, ভারতীয় কিংবা অন্য কোনও দেশের নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিপন্থী।’’

বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পরিষ্কার। যে ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হবে, তাকে গ্রহণ করা হবে। তবে সেটি অবশ্যই প্রচলিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অন্যদিকে বিএসএফের দাবি, জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য পাঠানো বহু আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। তাদের মতে, যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই অবস্থানের মধ্যকার ব্যবধানই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।

 

দৌলতপুরে নতুন উত্তেজনা

শুক্রবার (১২ জুন) ভোরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের চর বিলগাথুয়া এলাকায় ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ, চারজন নারী এবং চারজন শিশু রয়েছে।

বিজিবি ও স্থানীয় জনতা তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দিয়ে পুনরায় মাথাভাঙ্গা নদী পার করে ভারতীয় অংশে ফিরিয়ে দেয়।

প্রাগপুর বিজিবি কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘১২ জনকে পুশ ইন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ভারতের প্রায় ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।’’ কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

সীমান্তে নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় ভিন্ন। আগে যেখানে সীমান্ত উত্তেজনা মূলত অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত হত্যাকে কেন্দ্র করে দেখা যেত, এখন শূন্যরেখা ক্রমেই মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় দেখা গেছে, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের রাতের অন্ধকারে সীমান্তে এনে তারকাঁটার বেড়ার কাছাকাছি ফেলে রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কে বাংলাদেশি, কে ভারতীয়, আর কে রোহিঙ্গা— তা নির্ধারণ করাই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।

শুধু গত কয়েক সপ্তাহেই ২১টি পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। এসব ঘটনায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ দুই শতাধিক মানুষ ভুক্তভোগী ছিলেন।

কেন জটিল হচ্ছে সংকট?

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে অন্তত তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, জাতীয়তা যাচাইয়ের সংকট। সীমান্তে আনা ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত কাউকে বাংলাদেশি দাবি করলেও বাংলাদেশ প্রমাণ চায়। আবার অনেকের কাছেই কোনো বৈধ পরিচয়পত্র থাকে না। ফলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা। বাংলাদেশের মতে, যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্তে পাঠানো বিদ্যমান প্রটোকলের লঙ্ঘন। ভারতের মতে, তারা নিজস্ব আইনি কাঠামো অনুসরণ করছে এবং বাংলাদেশকে যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে। এই ব্যাখ্যাগত পার্থক্য কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব। সীমান্ত ইস্যু এখন আর শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তবাসীরা প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছেন, রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসূচি দিচ্ছে। একই সময়ে ভারতে অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক ও মানবিক সমস্যা ক্রমশ রাজনৈতিক মাত্রা পাচ্ছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ