৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

​গাজীপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং, বিপর্যস্ত জনজীবন, ক্ষুদ্র খামারিদের লোকসানের ভয়

আপলোড সময় : ১৫-০৬-২০২৬
​গাজীপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং, বিপর্যস্ত জনজীবন, ক্ষুদ্র খামারিদের লোকসানের ভয় মুরগির খামার

মোফাজ্জল হোসেন, শ্রীপুর (গাজীপুর) : গাজীপুরে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকাগুলোতে একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হচ্ছে। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষাসহ সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা বলছেন চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছেন তারা।

একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিংয়ে এমন পরিস্থিতি শ্রীপুরের মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দিনে ও রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি বিশেষ করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোল্ট্রি খাত। বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের কুলিং ফ্যান, ভেন্টিলেশন ও অনিয়মিত পানির সরবরাহের কারণে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীন এলাকায় দিনরাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বাসা-বাড়ীর মালিকেরা বলছেন ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং।

এদিকে, শহরের তুলনায় বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রাহকেরা। জেলার কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন মানুষ।

শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা এলাকার পোল্ট্রি খামারি মনির হোসেন বলেন, একটানা আধাঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই খামারের ভেতরে গরম অসহনীয় হয়ে যায়। ফ্যান বন্ধ থাকলে মুরগি হাঁপাতে থাকে। কয়েকদিন আগে লোডশেডিংয়ের কারণে আমার খামারে প্রায় শতাধিক ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে।

অপর খামারি সোহেল রানা বলেন, গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে খামারের ভেতরে তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। ফ্যান ও পানির লাইন বন্ধ হয়ে মুরগি অস্থির হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। এখন লাভের চেয়ে লোকসানের চিন্তাই বেশি করছি।

বরমী ইউনিয়নের গাড়ারন এলাকার আরেক দুগ্ধ খামারি জুবায়ের আহমেদ বলেন, প্রচন্ড গরমে গরুর দুধ অনেক কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় খরচ বহন করা কঠিন। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না।

জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাওনা জোনাল অফিসের আওতাধীন কাওরাইদ সাব ষ্টেশনের অধীনে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং থাকে। আমরা গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। বাকি ১০ ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং থাকে। বিদ্যুৎ নিয়ে এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেক কষ্টে আছি।

শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের কাশিজুলি গ্রামের কৃষক মোবাশে^র আলী বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আমরা বিদ্যুৎ পাই না। বর্তমানে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে সঠিক সময়ে জমিতে সেচ দিতে পারছি না। কী যে দুর্ভোগে আছি, বলে বুঝাতে পারব না।

শ্রীপুর পৌরসভার লিচুবাগান এলাকার গৃহিণী মাহফুজা আক্তার বলেন, সারা দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব নেই। এক সপ্তাহ ধরে শুধু রাতেই পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। বাচ্চাদের ঠিকমতো পড়াশোনাও হচ্ছে না।

বরমীর পাইটালবাড়ী গ্রামের গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, সাত দিন পরপর সবুজ সবজি ও অন্যান্য কাঁচামাল কিনে ফ্রিজে রেখে দেন। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজের মামালসহ খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁরা ঘুমাতে পারছেন না। রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এতে তাঁদের পক্ষে জীবন যাপন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

খামারি আবু তাহের বলেন, একটি খামার চালাতে সারাক্ষণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু দিনে-রাতে এত বেশি লোডশেডিং হচ্ছে যে ঠিকমতো মুরগি পালন করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

বরমী এলাকার তরুণ খামারি রফিকুল ইসলাম বলেন, ঋণ নিয়ে খামার করেছি। বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট বাচ্চা মুরগি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন ধরে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে খামারে স্বাভাবিক পরিবেশ রাখা কঠিন হয়ে গেছে। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, রোগবালাইও বাড়ছে।

একাধিক ডেইরি ও পোল্ট্রি খামারিরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকেই নতুন বাচ্চা তুলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিদ্যুৎতের লোডশেডিংয়ের ফলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন। অনেক খামারি ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলেও বর্তমানে তারা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে এর বড় প্রভাব পড়বে। পোল্ট্রি শিল্পে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মুরগি ও ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাবেন।

গৃহিণী নাজমা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎবিহীন পরিবেশে পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের বেলায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। রাতেও একই চিত্র, ফলে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

ময়মনসিংগহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আনোয়ারুল আলম বলেন, অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

শ্রীপুর উপজেলা সদর অংশটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছে রাজাবাড়ী এবং রাজেন্দ্রপুর গ্রীড থেকে। এ অংশে ডিমান্ড আছে ৫০ মেগাওয়াটের মত। এখানে লোডশেডিং পাচ্ছি ৪৫ থেকে ৫০% এর মত। চাহিদার তুলনায় অন এভারেজে ২৫ থেকে ৩০% এর মত কম পাচ্ছি।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শান্তনু রায় বলেন, মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুরে ২১২ মেগাওয়াট। আমরা ৩টা গ্রীড থেকে পুরো উপজেলাতে পাওয়ার পাই। শ্রীপুর গ্রীডে পাচ্ছি ২৫ শতাংশের মতো লোডশেডিং। শ্রীপুর গ্রীডে ডিমান্ড আছে ১০৫ মেগাওয়াটের মত। ক্যালকুলেশনে ৮০ শতাংশের মতো আসে পিক আওয়ারে। অফ পিক আওয়ারে লোডশেডিং আরো কম থাকে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ঘাটতি মোকাবিলায় প্রতিদিন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, এ জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে তারা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। এই সমিতি গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ