৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়ায় বেঁচে গেলো ইসলামী ব্যাংক

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১৬-০৬-২০২৬
খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়ায় বেঁচে গেলো ইসলামী ব্যাংক খুরশীদ আলম

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি গত দুই সপ্তাহে এমন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল— যা শুধু একটি ব্যাংকের নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। আমানতকারীদের দীর্ঘ সারি, প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন, এটিএমে নগদ অর্থের সংকট, আরটিজিএস সেবা ব্যাহত হওয়া, বড় অঙ্কের চেক সম্মান না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে আতঙ্ক— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্তই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা। সেটি হলো, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে সরিয়ে দেওয়া এবং পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা।

 

অনেকের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই সিদ্ধান্ত নিতে আরও দেরি করতো, তাহলে ইসলামী ব্যাংকের সংকট আরও গভীর হতে পারত এবং তার প্রভাব দেশের অন্যান্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল।

 

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খুরশীদ আলম

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

 

নিয়োগের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন গ্রাহক সংগঠন এবং ব্যাংকের একাংশ গ্রাহকের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, খুরশীদ আলম অতীতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের উত্থান ও ইসলামী ব্যাংক দখল প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তাকে চেয়ারম্যান করা মানে অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়কে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা।

ঈদ-পরবর্তী প্রথম কর্মদিবস থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং চেয়ারম্যান অপসারণের দাবি ক্রমেই জোরালো হতে থাকে। গ্রাহকদের বড় অংশের মধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা তৈরি হয়— খুরশীদ আলম থাকলে তারা ব্যাংকে আস্থা রাখতে পারছেন না।

আড়াই হাজার কোটি টাকা নয়, প্রয়োজন ছিল আস্থা

সংকটের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন— এটি কেবল তারল্যের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম দফায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়। পরে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পায় ইসলামী ব্যাংক।

কিন্তু প্রশ্ন ছিল, টাকা দিলেই কি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসে? বাস্তবতা বলছে, না।

কারণ গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলছিলেন মূলত আতঙ্ক ও অনাস্থা থেকে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন হচ্ছিল। বহু গ্রাহক হিসাব বন্ধ করে অন্য ব্যাংকে চলে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ সংকটের মূল ছিল অর্থের অভাব নয়, বিশ্বাসের অভাব।

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, কোনও ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মূলধন তার আমানত নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে না।

গ্রাহকদের ভাষা বুঝেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে তারল্য সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, শুধুমাত্র নগদ অর্থ সরবরাহ করে সংকট থামানো যাবে না।

গ্রাহকরা যে বার্তা দিচ্ছিলেন, সেটি ছিল ভিন্ন। তারা বলছিলেন, সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম এবং তার নেতৃত্বে গঠিত পরিচালনা কাঠামো।

অবশেষে রবিবার (১৪ জুন) রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কার্যত বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করে নেয় যে, সংকটের কেন্দ্র ছিল আস্থার সংকট এবং সেই সংকটের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন খুরশীদ আলম।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ