০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

১০ লাখ টাকার সীমা ঘিরে তোলপাড়

এনবিএফআই কেলেঙ্কারির দায় কেন আমানতকারীদের ওপর?

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১৭-০৬-২০২৬
এনবিএফআই কেলেঙ্কারির দায় কেন আমানতকারীদের ওপর? নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (প্রতীকী ছবি)

বহু বছর ধরে আটকে থাকা সঞ্চয়ের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন হাজারো আমানতকারী। চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, অবসরের নিরাপত্তা কিংবা জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) জমা রাখা অর্থ ফেরত না পেয়ে অনেকেই ইতোমধ্যে চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন। ঠিক এমন সময়ে সংকটে থাকা পাঁচটি এনবিএফআই বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এর সঙ্গে উঠে এসেছে নতুন এক বিতর্ক—প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে যে প্রস্তাবনা আলোচনায় এসেছে, তা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে আমানতকারীদের মধ্যে।

অনেকের প্রশ্ন, একজন গ্রাহক যদি ২০ লাখ, ৩০ লাখ বা ৫০ লাখ টাকা বৈধভাবে কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখেন, তাহলে তিনি কেন তার পুরো অর্থ ফেরত পাবেন না? কেন তার কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে? অর্থনীতিবিদদের একাংশও বলছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা শুধু আমানতকারীদের জন্য অন্যায্য হবে না, বরং পুরো আর্থিক খাতের ওপর জনগণের আস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

 

‘আমরা তো সরকারের নিয়ম মেনেই টাকা রেখেছি’

 

ক্ষুব্ধ আমানতকারীদের বক্তব্য, তারা কোনও অবৈধ বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানেই টাকা জমা রেখেছিলেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, লুটপাট কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

একজন আমানতকারী বলেন, ‘সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে। এখন যদি বলা হয় ২০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১০ লাখ টাকা ফেরত পাবো, তাহলে বাকি ১০ লাখ টাকার দায় কে নেবে?’’

 

আরেকজন ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, ‘‘যে ব্যক্তি ৫০ লাখ টাকা জমা রেখেছেন, তিনি কেন ৪০ লাখ টাকা হারাবেন? আমরা তো কোনও জুয়া খেলিনি বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করিনি। সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলেই রাষ্ট্র এসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে।’’

লুটপাটের দায় কার?

এনবিএফআই খাতের সংকট কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্টি হয়নি। বিভিন্ন তদন্ত, আদালতের নথি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের চিত্র।

বিশেষ করে পি কে হালদার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লোপাটের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দাবি করেছিলেন, পি কে হালদারের ক্ষমতার উৎস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী এবং নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এস কে সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদক তদন্তও চালিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমানতকারীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির কারণে অর্থ লুটপাট হয়ে থাকে, তাহলে তার খেসারত কেন সাধারণ গ্রাহকদের দিতে হবে?

২৭ হাজার আমানতকারীর ভাগ্যে কী আছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।

এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৪ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের মধ্যে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব মূল্যায়ন করতে চায়। এরপর আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ