তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়ায় নিমজ্জিত বসতভিটা। পানিবন্দি হয়ে বিপাকে মানুষ।
ভারী বৃষ্টি ও ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে নেমে আসলেও ভাটিতে পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়ার কারণে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তরের ৫ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার।
রবিবার (২৮ জুন) রাতে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব এসব কথা জানান।
তিনি জানান, ভারত গজলডোবা ব্যারেজের ৪০ টি গেট খুলে দেওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল (রবিবার) বিকেলের দিকে গেটগুলো খুলে ওেয়ার ফলে রাত ১১টা পর্যন্ত পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা জানান, এতে উত্তরের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের এসব জেলায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই ৫ জেলার ২৬টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
পানিবন্দি একাধিক পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২ দিন থেকে পানিবন্দি থাকলেও কেউ আমাদের কোনো খোঁজখবর রাখেনি।
পাউবো কর্তপক্ষ জানায়, আজ (সোমবার) দুপুর ১২টার দিকে তিস্তা নদীর পানির স্তর ছিল ৫২ দশমিক শূন্য সেন্টিমিটার, যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি যেকোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো।
এদিকে, হঠাৎ করে তিস্তা নদীর পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গীমারি, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি, কালীগঞ্জের শৈলমারী, চর বৈরাতী, রুদ্রেশ্বর, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন ও স্পারবাধ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা চরাঞ্চলের নদীর তীরবর্তী চরে বাদামখেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার বাদাম চাষি লোকমান মিয়া জানান, তিস্তার চরে ৭০ শতক জমি লিজ নিয়ে চিনাবাদাম চাষ করেছেন তিনি। কয়েকদিন পানি জমে থাকায় বাদামে পচন ধরেছে এবং গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, রাতে পানি কমলে আবার সকালে পানি বাড়ে। পানি বাড়া-কমার কারণে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। চলতি মৌসুমে আমন আবাদে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা অনেক বীজতলাও পানির কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।
রংপুরের চর চব্বিশ হাজারী গ্রামের কৃষক নজরুল হক বলেন, আজ রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি আরও বাড়ছে। শুনেছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের ধানের চারা, বাদাম ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হবে।
মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক বুলু মিয়া জানান, উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের কারণে ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে, গবাদি পশুসহ সন্তানদের নিয়ে বিপাকে রয়েছি।
চর রাজপুরের বাসিন্দা আসাদুল বলেন, গত দুদিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আছি। চেয়ারম্যান, মেম্বার কেউ কোনো খবর রাখেননি।
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, তিস্তার মধ্যবর্তী চরের কিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। চেয়ারম্যানদের তালিকা করতে বলা হয়েছে, তালিকা পেলেই শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি কখনও বিপৎসীমার উপরে, আবার কখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চরের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছি। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বেলা বাড়ার সঙ্গে পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন পাউবোর এই নির্বাহী প্রকৌশলী।