এনসিপি সমাবেশে বিস্ফোরণের পর নাহিদ ইসলামসহ দলের নেতারা
সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’য় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ গত কয়েক বছর বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা সংঘর্ষ হলেও কোনও সমাবেশে ককটেল বা হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি। এ হামলার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে, এমন বিশ্লেষণও হচ্ছে।
কারণ ওই সমাবেশে ছিলেন এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম, যিনি সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। আরও ছিলেন আরেক সংসদ সদস্য ও দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ জুলাই আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা। তাদের উপস্থিতিতে এমন হামলা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের ঘটনাকে অনেকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির পূর্ব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এ ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ঘটনার দিন রাতেই রাজধানীতে বিক্ষোভ করে ককটেল বিস্ফোরণের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন দলটির নেতারা। তারা মনে করেন, প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতেই এই হামলা। একই ধরনের অভিযোগ এনেছে তাদের প্রধান মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এ ধরনের হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিরই বহিঃপ্রকাশ।’’
তিনি মনে করেন, সরকার অতীতের মতো বিরোধী দলকে দমনের চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের পরিণতি ভালো হয়নি। তবে হামলা নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে রাজনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘‘এনসিপির সমাবেশে কারা হামলা করেছে, সেটা তদন্তের বিষয়।’’ তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে। এটিও তেমন ঘটনা। তবে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়।
আহতদের সর্বশেষ অবস্থা
এনসিপি সূত্রে জানা যায়, তাদের সমাবেশে হামলার ঘটনায় জুলাই শহীদ শ্রাবণ গাজীর বাবা মান্নান গাজী ও দুজন সাংবাদিকসহ ৫ জনকে আহত অবস্থায় এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত অন্যরা হলেন—শাহীন খন্দকার, জসীম উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, ডিবিসি নিউজের ক্যামেরাপারসন মো. মজনু এবং এনপিবি নিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মো. সাঈদুল ইসলাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা জেলা উত্তরের আহ্বায়ক নাবিলা তাসনিদ জানান, এরই মধ্যে আহত ৫ জনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আরেকজন এখনও হাসপাতালে আছেন। তিনি বাম পায়ে আঘাত পেলেও তেমন গুরুতর নন। তার চিকিৎসা চলছে।
সাভারে কী ঘটেছিল?
দেশজুড়ে জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসেবে সোমবার (৬ জুলাই) রাতে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠে সমাবেশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণে ঘটনা ঘটে। এতে দুই সংবাদকর্মীসহ কমপক্ষে ৬ জন আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণের আগে সমাবেশস্থলের বিদ্যুৎ চলে যায়। তবে কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসে। এরপর রাত পৌনে ১০টার দিকে সমাবেশ চলাকালে বিস্ফোরণ ঘটে।
এ ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে সাভার মডেল থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেছে এনসিপি। এ ঘটনায় যুবলীগের দুই কর্মীকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
বিস্ফোরণের সময় মঞ্চে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সার্জিস আলম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ঢাকা জেলা এনসিপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন।
‘হালকা করে দেখার সুযোগ নেই’
দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশে এই সময়ে একটি দলের সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন রাজনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে কেউ কেউ ফায়দা নিতে চেষ্টা করতে পারে। তাই বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারা।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। বিএনপি, এনসিপি বা জামায়াত যে দলের সমাবেশেই হামলা করা হোক না কেন, বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘বার্তাটি ভালো নয়। একটি রাজনৈতিক দলের ওপর হামলা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমি বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর মাধ্যমে কোনও মহল থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা কিনা সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।’’