০৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

​লাগামহীন ট্রলার ভাড়া ও হোটেল সিন্ডিকেট

চেনা রূপ হারিয়ে পর্যটকশূন্য নিকলী হাওর

আপলোড সময় : ০৯-০৭-২০২৬
চেনা রূপ হারিয়ে পর্যটকশূন্য নিকলী হাওর চেনা রূপ হারিয়ে পর্যটকশূন্য নিকলী হাওর

এ জেড আল মুজাহিদ, কিশোরগঞ্জ: দিগন্তজোড়া রূপালী জলরাশি, দৃষ্টিনন্দন বেড়িবাঁধ আর পানিসহিষ্ণু ভাসমান করচবনের মায়াবী হাতছানি—বর্ষা এলেই কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর একসময় মুখরিত থাকত হাজারো পর্যটকের কোলাহলে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসতেন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ। তবে প্রকৃতির সেই অপরূপ রূপ এবার আর পর্যটকদের টানতে পারছে না। ভরা বর্ষার এই চড়া মৌসুমেও নিকলী হাওর এখন সম্পূর্ণ পর্যটকশূন্য। লাগামহীন ট্রলার ভাড়া, খাবারের দোকানে প্রকাশ্য সিন্ডিকেট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং চরম প্রশাসনিক নজরদারির অভাব—সব মিলিয়ে একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রটি এখন তার চেনা প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

পানি সংকট ও ডুবোচরের হানা
নিকলী হাওরের মূল আকর্ষণই হচ্ছে এর বিস্তীর্ণ ও উত্তাল জলরাশি। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে এসেও হাওরে কাঙ্ক্ষিত পানির দেখা মিলছে না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা নৌভ্রমণের যে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে আসেন, তা এবার পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে। উল্টো অনেক জায়গায় ডুবোচর জেগে ওঠায় ট্রলার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে পানির এই অপর্যাপ্ততা, অন্যদিকে পর্যটকদের অনুপস্থিতিতে হাওরের নৌকার মাঝিদের অবস্থা এখন শোচনীয়। অনেকেই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তৈরি করা শত শত বড় ট্রলার ও নৌকা এখন ঘাটে অলস বেঁধে রাখতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে যেখানে দম ফেলার ফুসরত থাকত না, সেখানে এখন সারাদিন বসে থেকেও একটি ভাড়ার দেখা মিলছে না। বোরো ধান হারিয়ে অনেক ক্ষুদ্র মাঝি ধারদেনা করে নৌকা কিনে যে আশার আলো দেখেছিলেন, পর্যটক সংকটে এখন তাদের ঋণের কিস্তি ও সহকারীর (হেলপার) বেতন দেওয়াই বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লাগামহীন ট্রলার ভাড়া ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য;
নিকলী হাওরের এই করুণ দশার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাঝিদের একচেটিয়া সিন্ডিকেট ও লাগামহীন খরচ। পর্যটকদের অভিযোগ, এখানে কোনো প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোনো দোকানেই কোনো মূল্যতালিকা টাঙানো নেই। বাজারে যে দুই লিটারের সাধারণ পানির বোতলের মূল্য সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, তা পর্যটন এলাকায় প্রকাশ্য অনিয়ম করে ৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি হাওরের মাছ খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে হোটেলে যাওয়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে খাবারের দাম। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের যুক্তি, জিনিসপত্র, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে এবং ফ্রিজে পানি ঠান্ডা করার খরচের জন্য কিছুটা বেশি দাম রাখা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে ট্রলার ভাড়ায়। উপজেলা প্রশাসন বা মাঝিদের সমিতি থেকে কোনো নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ না করায় মাঝিরা একেক রকম দাম চাচ্ছেন, যা পুরোপুরি দর-কষাকষির ওপর নির্ভর করছে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দিনে এই ভাড়া আকাশচুম্বী হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ দিনে নিকলী বেড়িবাঁধ থেকে মিঠামইন যেতে যেখানে ৩ হাজার টাকা এবং ছাতিরচর যেতে ১ হাজার ২০০ টাকা লাগে, সেখানে শুক্রবার ও শনিবার সেই ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭ হাজার টাকা এবং ৩ হাজার টাকায়। এই লাগামহীন খরচ ও একচেটিয়া সিন্ডিকেটের কারণে পর্যটকরা দ্বিতীয়বার আসার আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলছেন।

আবর্জনার ভাগাড় ও নাগরিক সুবিধার অভাব
প্রাকৃতিক পরিবেশ চমৎকার হলেও রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাব স্পষ্ট নিকলী বেড়িবাঁধ এলাকায়। পর্যটকদের বসার স্থানসহ চারপাশের যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট ও আশপাশের বাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলে পুরো এলাকাকে একটি ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। ডাস্টবিন বা ময়লা ফেলার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে এই পর্যটনকেন্দ্র। এছাড়া নারী পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুম বা বিশ্রামের ভালো কোনো নাগরিক সুবিধা এখানে এখনও গড়ে ওঠেনি।

উধাও সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তাহীনতা
বিগত বছরগুলোতে হাওরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর পানিতে নামার নিষেধাজ্ঞা, লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সাঁতার না জানলে পানিতে না নামার মতো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেখা যেত। তবে এবার স্থানীয় ব্যবস্থাপনার ও উদাসীনতায় সেই নির্দেশনাগুলোর সিংহভাগই উধাও হয়ে গেছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকরা। ছুটির দিনেও পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের দৃশ্যমান টহল চোখে না পড়ায় পর্যটকরা নিজেদের চরম নিরাপত্তাহীন মনে করছেন। যদিও স্থানীয় থানা পুলিশ প্রশাসনের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে এবং নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঐতিহ্য রক্ষা ও উত্তরণের উপায়
২০০০ সালের দিকে নিকলী সদরকে বর্ষার তীব্র ঢেউ ও ভাঙন থেকে রক্ষা করতে সরকার প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দৃষ্টিনন্দন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। একই সাথে ছাতিরচর গ্রাম রক্ষায় রোপণ করা হাজারো করচগাছ এবং বর্ষার সাগরের মতো জলরাশি মিলে একসময় এটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও পর্যটন চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সুশাসনের অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। এই পর্যটন খাতের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে প্রশাসনকে ট্রলারের ভাড়া নির্দিষ্ট করে তালিকা টাঙাতে হবে, হোটেলগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বাজার তদারকি করতে হবে, ময়লা পরিষ্কারের আধুনিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও দৃশ্যমান পুলিশি নিরাপত্তা বুথ স্থাপন করতে হবে। অন্যথায়, সম্ভাবনাময় এই পর্যটন খাতটি অচিরেই চিরতরে তার অস্তিত্ব হারাবে।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ