১১ অক্টোবর ২০২৬ , ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

জলাবদ্ধতায় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি?

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১৩-০৭-২০২৬
জলাবদ্ধতায় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি? জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম নগরীর একটি এলাকা
 

টানা ভারী বর্ষণ আর জলাবদ্ধতা বাংলাদেশে নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নগর পরিকল্পনার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একসময় জলাবদ্ধতাকে শুধু নগরবাসীর দুর্ভোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি দেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় কাঠামোগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

কারণ জলাবদ্ধতা শুধু মানুষের চলাচল ব্যাহত করে না; এটি একসঙ্গে বন্দর, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি, শ্রমবাজার, স্বাস্থ্য খাত এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির ক্ষতি কয়েক মাস পর্যন্ত অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বৃহত্তম পাইকারি বাজার, শিল্পাঞ্চল এবং ব্যবসাকেন্দ্রগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় আমদানি-রফতানি, উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও জলাবদ্ধতায় কোটি টাকার আমদানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—জলাবদ্ধতা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।

 

বন্দর থামলে থমকে যায় অর্থনীতির চাকা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পকারখানার যন্ত্রাংশ, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বড় অংশ এই বন্দর দিয়েই দেশে আসে। আবার দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকসহ অধিকাংশ রফতানি পণ্যও এখান থেকেই বিদেশে যায়।

 

এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলো জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ঢাকার শিল্পাঞ্চল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রেও এর প্রভাব পড়ে।

পণ্যবাহী ট্রাক আটকে যায়, কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হয়, বন্দরে পণ্যের জট তৈরি হয় এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে না পারলে রফতানিকারকদের জরিমানা গুনতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের অর্ডারও ঝুঁকিতে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ  বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, শিল্প, বাণিজ্য এবং পরিবহন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে ইতোমধ্যে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়েছে এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটে।’’

তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, ‘‘চট্টগ্রামের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের আয় কমেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘ঢাকা চেম্বারের মতে, জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ও সক্ষম ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় আগামী বছরগুলোতে জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।’’



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ