ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ঘসে পড়েছে ঘর, এখনও পানিবন্দি চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ
অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায়। জেলাগুলো হলো- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এসব জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হন অর্ধশতাধিক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ। যাদের অধিকাংশের বাড়িঘর ডুবে গেছে। এখন পর্যন্ত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি আছেন। তবে বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসন যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের গাফিলতি, সমন্বয়হীনতা এবং ত্রাণ বিতরণে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় লোকজন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্যমতে, পূর্বপ্রস্তুতির অভাব ও মাঠপর্যায়ে সময়মতো সাড়া না দেওয়ার কারণে লাখ লাখ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রবিবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ চট্টগ্রামকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখানকার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে বন্যায় পানিবন্দি রয়েছেন। মানুষ খুব কষ্টে আছে। অথচ স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের কেউ আসেনি এখানে। অবহেলা হোক, যে কারণেই হোক, দোষ দিয়ে লাভ নেই, সরকার পারছে না। যার যার সক্ষমতা আছে সবাই যদি এগিয়ে আসি, এই মানুষগুলোকে কিছুটা হলেও আমরা সহযোগিতা করতে পারবো।’
ওই দিন দুপুরে চট্টগ্রামের আনোয়ারার রায়পুর ইউনিয়নের দোভাষী বাজার এলাকায় বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের সময় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপকূলীয় বেড়িবাঁধের বেহাল অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বেড়িবাঁধের কারণে এখানে কয়েক বছর ধরে পানি জমছে। এখানে বেড়িবাঁধের জন্য কয়েক লক্ষ কোটি বাজেট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সময় এখানে লুটপাট করা হয়েছে।’
প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
স্থানীয় লোকজনও বন্যা ও পাহাড়ি ঢল মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতা, উদ্ধার কার্যক্রমে ধীরগতি এবং দূরবর্তী এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসনের অনুরোধে পরবর্তীতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পূর্বপ্রস্তুতি ও আগাম সতর্কবার্তা প্রদানে ঘাটতি ছিল জেলা প্রশাসনের। টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আগে থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের তৎপরতা কম ছিল।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনা
বন্যা শুরু হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে ধারণক্ষমতার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা এবং তাৎক্ষণিক খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট দেখা গেছে বলেও জানিয়েছেন অনেকে। আবার উদ্ধার কার্যক্রমে ধীরগতি ও সক্ষমতার অভাব ছিল। বিশেষ করে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর মতো দুর্গম উপজেলাগুলোতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়লেও জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী জলযান বা সরঞ্জাম ছিল না। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করার পর জেলা প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী (১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন) উদ্ধারকাজে নামে। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আছে। প্রধান সড়ক বা যোগাযোগ সহজ এমন এলাকাগুলোতে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছালেও দুর্গম গ্রামগুলোতে দিনভর মানুষ না খেয়ে কাটিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত চাল ও নগদ অর্থ মজুত থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি এবং তা দ্রুত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, চট্টগ্রামের নদী ও খালগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং বা রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে জনপদ প্লাবিত হয়েছে। নগরী ও আশপাশের উপজেলার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করতে স্থানীয় অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে জেলা প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি কোনও কার্যকর সমন্বয় দেখা যায়নি।
কী কী পদক্ষেপ নিলো প্রশাসন
জেলা প্রশাসন বলছে, বন্যাকবলিত ও পাহাড়ধসের এলাকাগুলোতে দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে ১০ দফা জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকায় সার্বক্ষণিক তদারকি এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিপুল সংখ্যক দুর্গত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ঝুঁকি এড়াতে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের অংশ হিসেবে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য অসুস্থতা রোধে মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা হয়। দুর্গত এলাকায় চুরি ও ডাকাতি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।