গ্যাসের দাবিতে গত ২২ জুলাই এয়ারপোর্ট সড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা
দেশের শিল্প খাত এখন এক গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির জেরে এক সপ্তাহ ধরে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর অসংখ্য কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি উৎপাদন চালাতে পারছে না।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে শুধু উৎপাদনই নয়, রফতানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। তাদের দাবি, দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানা বর্তমানে আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধের অবস্থায় রয়েছে।
শিল্পে গ্যাস না থাকায় থমকে আছে উৎপাদন
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি—সব খাতেই গ্যাসের চাপ কমে গেছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ চালিয়ে গেলেও কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন লাগতে পারে।
গাজীপুর-সাভার-নারায়ণগঞ্জে উৎপাদনে ধস
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলো। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অনেক কারখানায় স্বাভাবিকভাবে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্প-কারখানার অবস্থাও একই রকম। উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নরসিংদীর বস্ত্রশিল্প এলাকায় অনেক ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের বস্ত্রশিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল উৎপাদন হয় এ অঞ্চলে। ফলে সংকট দীর্ঘ হলে পুরো পোশাক খাতেই এর প্রভাব পড়বে।
রফতানি খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, কাগজ, স্পিনিং, ডাইংসহ অধিকাংশ রফতানিমুখী শিল্প গ্যাসনির্ভর।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে না। এতে ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা, বাজার হারানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
‘গ্যাস, অর্থ ও নিরাপত্তা: তিন সংকটে শিল্প’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও রয়েছে।
তার ভাষায়, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে কার্যকর মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না।
তিনি বলেন, ‘‘শিল্প সচল না থাকলে সরকারের কর ও ভ্যাট আদায়ও কমে যাবে। তাই শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’’
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘দেশের বর্তমান গ্যাসসংকট নতুন কোনও সমস্যা নয়—এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। সরকার সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। তবে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।’’
তিনি বলেন, ‘‘অতীতে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয়নি। সেই ঘাটতির মূল্যই এখন শিল্প খাতকে দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব না হলে সরকার বিকল্প উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে পারে। আর্থিক প্রণোদনা, কর-সুবিধা বা অন্য কোনও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার অন্তত একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।’’
তার ভাষায়, বর্তমান ক্ষতির পুরোটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে একা বহন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তাই সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে একই ধরনের সংকট বারবার দেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে না পারে।