শুক্রবার এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি নামে এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উপস্থিত ছিলেন।
তিন অংশীদার দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, যেকোনও ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই চুক্তির লক্ষ্য। চুক্তির শর্তানুযায়ী, তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ করা হলে তা সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনটি দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্বের স্থায়ী বন্ধন ও ইসলামি সংহতির পাশাপাশি পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ এবং সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুক্তি যৌথ নিরাপত্তা জোরদার, অঞ্চলজুড়ে এবং এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রচারের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে তিন দেশের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
শক্তিশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরবে পৌঁছান এবং মক্কায় ওমরাহ পালন করার পরদিনই এই চুক্তির ঘোষণা এলো। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশে শুক্রবার সৌদি আরব সফর করেন।
এখন কেন এই চুক্তি?
আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যকার এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি রাতারাতি হয়নি; বরং এটি বেশ কিছু দিন ধরে প্রক্রিয়াধীন ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা শুরুর পরপরই তিন দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে চুক্তির আলোচনা আরও গতি পায়।
যদিও তুরস্ক ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলের উত্তেজনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু সৌদি আরব, যেখানে মার্কিন সামরিক সম্পদ ও অবকাঠামো রয়েছে, তারা ইরান এবং ইয়েমেনের হুথিদের আক্রমণের শিকার হয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এবং জর্ডানেও হামলা চালিয়েছে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
তবে তিন দেশই ইরানের যুদ্ধ এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলার বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে। তাদের দাবি, তারা ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে এবং তারা নিজেরাও মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে।
তুরস্কের আঙ্কারা থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক রসুল সরদার জানান, সেখানকার কর্মকর্তাদের মতে, আঞ্চলিক উত্তেজনাই এসব দেশকে এক ছাতার নিচে আসতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের পরের ঘটনা প্রবাহ এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন ও সীমানা সম্প্রসারণের নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালি সংকট এবং ইরানে চলমান হামলা ও তার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা।
তিনি আরও বলেন, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে এসে এই তিনটি বৃহৎ দেশকে একটি বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছে।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক ইসলামি সম্মেলনে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন এবং যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির রূপরেখা কেমন হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেন।
এই বৈঠকের আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার পরই রিয়াদ ও ইসলামাবাদ সেই চুক্তি করেছিল।
জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের দক্ষিণ ও বিস্তৃত ইউরোপ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তুরস্কের আঞ্চলিক পরিচালক ওজগার উনলুহিসারসিকলি জানান, বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা উঠে যাওয়ার পর এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তৈরি হয়েছে, যা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে।
তিনি বলেন, তিনটি দেশই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। মতপার্থক্য সত্ত্বেও তারা মনে করে, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি। অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিভাজন, গৃহযুদ্ধ এবং অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর ক্ষমতায়নকে তারা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার উৎস হিসেবে দেখে।
কী রয়েছে এই চুক্তিতে?
বিশ্লেষকদের মতে, ত্রিপক্ষীয় এই চুক্তিটি আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে আগে থেকেই বহাল থাকা একটি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি প্রতিটি দেশের সামরিক ও আর্থিক শক্তিকে কাজে লাগাবে। সামরিক দিক থেকে তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ, আর পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
উনলুহিসারসিকলি বলেন, তিন অংশীদার পরস্পরের পরিপূরক শক্তি নিয়ে এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতা, সৌদির আর্থিক সামর্থ্য ও প্রভাব এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মনে রাখতে হবে এটি তিনটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত, সামরিক ও প্রতিরক্ষা-শিল্প সমন্বয়ের একটি রূপরেখা, এটি ন্যাটোর মতো সামরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়।
তুরস্কের গাজিয়ানতেপের হাসান কালিয়নকু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক মুরাত আসলান বলেন, এই চুক্তিটি সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, আমরা জানি সৌদি আরব কয়েক দশক ধরে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা পণ্য আমদানির জন্য বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এটি মোটেও সাশ্রয়ী নয় এবং তাদের নিজেদের ভূখণ্ডেই প্রতিরক্ষা খাত গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তুরস্ক ও সৌদি আরব দুটি বিষয়ে একই চিন্তাধারা পোষণ করে: প্রথমত ইরান, যার সঙ্গে পাকিস্তানেরও সীমানা রয়েছে। সৌদিদের মনে বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে যে ইরান তাদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। সুতরাং এই চুক্তি তাদের নিরাপত্তাকে প্রসারিত করবে।