০২ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প জলাবদ্ধতায় কাজে আসেনি , ডুবছে ভবদহ

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ১২-০৮-২০২৬
১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প জলাবদ্ধতায় কাজে আসেনি , ডুবছে ভবদহ নদীপথ পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি সাগরে পৌঁছাতে পারছে না। এতে করে ভবদহ অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত


খুলনা ও যশোর অঞ্চলের ভবদহ অববাহিকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। বরং অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের কারণে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, জোয়ার-ভাটার নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ রুদ্ধ করে খননকাজ পরিচালনা করায় খর্ণিয়া থেকে ভাটি অঞ্চলের প্রায় ৭ কিলোমিটার নদীপথ পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি সাগরে পৌঁছাতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রীনদীর প্রায় সাড়ে ৮১ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্প সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ গত ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই এর বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, খর্ণিয়া সেতুসংলগ্ন এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে এক্সকাভেটর দিয়ে নদী খনন করায় জোয়ারের পানির সঙ্গে আসা বিপুল পলি নদীর তলদেশে জমতে থাকে। এতে খর্ণিয়া থেকে তেলিগাতি পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হয়ে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, যে নদীর গভীরতা এক বছর আগেও প্রায় ৩০ ফুট ছিল, বর্তমানে তার অনেকাংশই প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

এর ফলে খর্ণিয়ার বিল, বিল সিঙ্গা, ডোমবার বিল, বিল তাওয়ালিয়া, আগরঘাটি, ভায়না, বরুনা, সালাতিয়া, দহকুলা, নাদিয়া, জোয়ারেরডাঙ্গা, বামুন্দিয়া, গোনালীসহ যশোর ও খুলনা অঞ্চলের অন্তত ৩০টি বিল ও অর্ধশতাধিক গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। কৃষিজমি, মৎস্যঘের ও গ্রামীণ সড়কও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় কৃষক ওহিদ শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদী খননের নামে যে ক্ষতি হয়েছে, তা অন্য কোনো দুর্যোগেও হতো না। ‘জোয়ার-ভাটা বন্ধ করে নদী খননের এমন উদাহরণ আগে দেখিনি। এর মাশুল এখন সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।’
 

কৃষক হুমায়ুন কবির, ফেরদৌস ফকির ও পলাশ মোড়লসহ একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয়দের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা বলেন, শুরু থেকেই জনগণ সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এখন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবেন তারা।

খর্ণিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোল্যা আবুল কাশেম বলেন, জোয়ার-ভাটা বন্ধ করে খননকাজ পরিচালনার কারণে খর্ণিয়া থেকে তেলিগাতি পর্যন্ত নদীপথ পলিতে ভরে গেছে।

তিনি বলেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে একটি মাত্র ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কাজ চলছে। ফলে অগ্রগতি খুবই ধীর। এভাবে চললে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কুলবাড়িয়া দুই-ভেন্ট রেগুলেটর পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় পলি অপসারণের কাজ চলছে। তবে দ্রুত পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করতে অন্তত আরও দুটি ড্রেজার মোতায়েন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রকল্পের ব্যবস্থাপক উৎস্য দত্ত সৌরভ বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ড্রেজিং মেশিনে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, যার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমানে কাজ চলছে। পাইপ স্থাপনসহ বিভিন্ন কারিগরি কারণে মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে পলি অপসারণের কাজ সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।

এদিকে, বর্ষার মাঝামাঝি সময়েও কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হওয়ায় ভবদহ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পলি অপসারণ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা না গেলে চলতি মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ