অনিয়ম দূর্নীতির আখড়া বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস
অনিয়ম দূর্নীতির আখড়া বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস
মজিদুল ইসলাম, নোয়াখালী : অনিয়ম দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস। এই অফিসের একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, নানা অনিয়ম, দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, উপজেলা নির্বাচন অফিসে নতুন ভোটার হওয়া, এনআইডি সংশোধন, ভোটার হস্তান্তর, আঙ্গুলের চাপ পরিবর্তন, ছবি পরিবর্তনসহ সব ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয়না।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নিয়মে নতুন ভোটার হওয়ার জন্য নির্ধারিত কোনো ফি না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে প্রতি আবেদনকারীর কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষ এই টাকার অংক ৫০ হাজার থেকে এক বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উঠে।
সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগের অনুসন্ধানে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার বুলবুল আহমেদ, সহকারী নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ আলী হোসেন, অফিস সহায়ক মোঃ শহিদ উল্যা , পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোঃ আরিফুর রহমান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল হোসেন ও তামান্না ফেরদৌস সহ নির্বাচন অফিস কেন্দ্রীক বিশাল দালালচক্র ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের সাথে উপজেলা পরিষদের সামনে ও চৌরাস্তার কিছু কম্পিউটার দোকানদার ও দালাল চক্রের সম্পৃক্ততাও রয়েছে।
সূত্র জানায়, একজন সেবা প্রত্যাশী নতুন ভোটার হওয়াসহ বিভিন্ন কাজে উপজেলা নির্বাচন অফিসে যান। তারা নিময়নীতি মেনে কোন দালাল না ধরে সরাসরি গেলে বিভিন্ন ভাবে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। আর দালালেরর মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের পর গেলে দ্রুত ছবি তোলা ও ভোটার নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদন পত্রের পেছনে সহকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন, অফিস সহাকারী মোঃ শহিদ উল্যা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোঃ আরিফুর রহমানসহ দালালদের নাম, সই বা বিভিন্ন চিহৃ দেয়া থাকে। যার কয়েকটি ছবি ও ভিডিও এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। টাকা দিলে আবেদনের সাথে দেয়া কাগজপত্র সঠিক কিনা তাও ঠিক মতো যাচাই করা হয়না। আর টাকা না দিলে বা দালালদের সাথে চুক্তি বদ্ধ না হলে সঠিক কাগজপত্র দিয়েও হয়রানির শিকার হতে হয় গ্রাহকরা।
সম্প্রতি অফিস সহায়ক মোঃ শহিদ উল্যা শহিদ উল্যাহর বিরুদ্ধে এক সেবা প্রত্যাশীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেয়ার একটি ছবি সামাাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যা দেখে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভূয়া জন্মনিবন্ধন ও কাগজপত্র দিয়ে ভিন্ন জেলার একাধিক ব্যক্তি বেগমগঞ্জ উপজেলার ভোটার হয়েছেন। প্রতিটি এনআইডির জন্য ৩০ হাজার টাকা করে ঘুষ লেনেদেন হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, স্বপন নুসরাত- NIDFN121048654, সুমাইয়া আক্তার- NIDFN121109906, মিল্লাদ হোসেন আবির- NIDFN120992005, মুক্তা আক্তার- NIDFN120892874, রাকিন আবরার NIDEN119661049, যোবায়ের আহম্মদ তামিম - NIDEN120390333 মোঃ আলী আকবর- NIDFN1210087058, জান্নাতুল ফেরদাউস সালমা- NIDFN120803686, সুমি আক্তার – NIDFN121011032, আব্দুল কাইয়ুম—NIDFN120753002, ওমর ফারুক—NIDFN120903021, ছালমা আক্তার – NIDFN 120941638, মোঃ শাহী – NIDEN121075611, মোসা: নাছিমা বেগম – NIDEN121079870, আমির হোসেন – NIDEN120642148, সাজিদুল ইসলাম NIDFN120746817, ইয়াছিন আরাফাত – NIDEN 120746583, তামিম – NIDFN120785824, আহাদ হোসেন – NIDFN120820857, আল মাহমুদ – NIDEN120829506, সাহাদাত উল্যা – NIDFN 120480930, মিরাজ হোসেন – NIDEN120829858, ইয়াছিন আরাফাত – NIDFN120866597, মোঃ জাহেদুল ইসলাম NIDFN120631674, মোঃ ইমরান হোসেন -NIDFN121007951, মোঃ সফিকুর রহমান NIDFN120907152, সহ শতাধিক ব্যক্তিকে বেগমগঞ্জ উপজেলায় দালালের মাধ্যমে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫-১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভোটার নিবন্ধন করা হয়েছে। আবেদনের সাথে সংযুক্ত নাগরিক সনদ, ট্যাক্স, জমির খতিয়ান ভুয়া কাগজপত্র (যা হাতে লিখা এডিট করা হয়েছে বলে বিদ্যমান)। এই টাকা অফিসের বড় কর্তা থেকে ছোট কর্তা সবাই ভাগবাটোয়ারা করে নেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এ ধরনের অনিয়ম সরকারের সেবামূলক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভোটার তালিকার এমন গড়মিল আগামীতে নির্বাচনী ব্যবস্থার উপরও নাগরিকদের আস্থা কমিয়ে দিবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
শিহাব হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ করে বেগমগঞ্জে ভোটার হয়েছেন। এ জন্য ডাটা এন্টি অপারেটর নাজমুল ও তামান্নাকে দিতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা।
নতুন ভোটার হওয়ার জন্য উপজেলার রসুলপুর থেকে আসা আবদুল করিম জানান, তিনি প্রবাসে থাকেন, তাই যথা সময়ে ভোটার হতে পারেননি। এবার দেশে এসে নতুন করে ভোটার হওয়ার জন্য সরাসরি আবেদন করতে গেলে কাগজপত্র ঠিক নেই বলে ফেরত পাঠান। পরে অফিসের এক দালালের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি নতুন ভোটার হন।
জুয়েল রানা নামের এক সেবা প্রত্যাশী জানান, তিনি নতুন এনআইডি করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে অনেক হয়রানির শিকার হন। পরে অফিসের সহকারি নির্বাচন অফিসার আলী হোসেন ও অফিস সহায়ক শহিদ উল্যাহকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে এনআইডি করান। শুধু আবদুল করিম ও জুয়েল রানা নয়, প্রতিদিন শত শত সেবা প্রত্যাশী নির্বাচন অফিসে সেবার জন্য গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
ভূক্তভোগিরা এ সব অভিযোগের সঠিক তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন, অফিস সহাকারী মোঃ শহিদ উল্যা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোঃ আরিফুর রহমান কেউ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার বুলবুল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সত্য নয়, আমরা সব সময় চেষ্টা করি সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য।
বুধবার দুপুরে এ বিষয়ে জেলা সিনিয়ার নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম জানান, বেগমগঞ্জের নির্বাচন অফিসে সেবা প্রত্যাশিদের হয়রানি ও দালাল চক্রের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষন করছি। অফিস ও অফিসের বাইরের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কমেন্ট বক্স