১৪ অক্টোবর ২০২৬ , ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে নতুনভাবে শুরু হয় মঞ্জুর পথচলা

আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে নতুনভাবে শুরু হয় মঞ্জুর পথচলা সংগৃহীত ছবি

আব্দুল্লাহ আল আমিন, রংপুর : তখনো রংপুর শহর পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সাইকেলের পেডেলে পা রাখেন মঞ্জু হোসেন। ৪ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে যান রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে। বিদ্যুতের খুঁটির পাশে প্রতিদিনের পত্রিকার বান্ডিল খুলে একে একে সাজিয়ে রাখেন। কিছুক্ষণ পরই পরিচিত ক্রেতারা আসতে শুরু করেন। কেউ দৈনিক পত্রিকা কিনে চলে যান, কেউ আবার দুএকটি কথা বলে খোঁজখবর নেন। আবার কেউ অলস সময় পার করেন তার পত্রিকা পড়ে।

অনলাইনের দাপটে যখন ছাপা পত্রিকার বাজার দিন দিন ছোট হচ্ছে, তখনো দুই দশক ধরে এই পেশা আঁকড়ে আছেন এই মঞ্জু হোসেন। পত্রিকা বিক্রির আয়ে চলে তাঁর জীবন, চলে বৃদ্ধ মা আনোয়ারা বেগমের জীবনও। পাশাপাশি সহযোগীতা করেন ভাই-বোনের পরিবারকে।

মঞ্জুর বাড়ি রংপুর নগরীর কোতয়ালী থানাধীন ০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তকেয়ার পাড় এলাকার বয়স ৪২ বছর। পত্রিকা বিক্রির সঙ্গে তাঁর পথচলার গল্পটাও সংগ্রামের। ২০০৫ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে এ পেশায় নামেন তিনি। অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ৫ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাবা নুর নবী ছিলেন সবজি বিক্রেতা। বড় সংসারের অভাব-অনটন তাঁকে অল্প বয়সেই জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য করে।

মঞ্জু বলেন, বাবা বেঁচে নেই। মা আনোয়ারাকে নিয়েই এখন তাঁর ছোট সংসার। বিয়ে করেননি। পরিবারের অন্য সদস্যরা আলাদা থাকলেও মায়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিয়েছেন। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সাইকেল নিয়ে বের হন। প্রেসক্লাবে পত্রিকা সাজানো, ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া, আবার পরিচিত দোকান ও বিভিন্ন অফিসে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া এসব কাজেই কেটে যায় দিনের প্রথম ভাগ।

একসময় এই পেশায় ভালো আয় ছিল। ১০-১২ বছর আগেও প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হতো। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের সংবাদ পড়ার অভ্যাস পাল্টে দিয়েছে। অনলাইনে মুহূর্তেই খবর পাওয়া যায় বলে ছাপা পত্রিকার ক্রেতা কমেছে, কমেছে সার্কুলেশনও।

মঞ্জু হোসেন জানান, আগে সকালে অনেক মানুষ পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করত। এখন বেশির ভাগই মুঠোফোনে খবর পড়ে। কাগজের চাহিদা আগের মতো নেই। তারপরও এ পেশা তিনি ধরে রেখেছেন। মাসে তাঁর আয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। এই আয় দিয়েই চলে নিজের খরচ, মায়ের ওষুধ, খাবার ও সংসারের অন্যান্য খরচ। আয় কমলেও পেশা বদলের কথা ভাবতে পারেন না। কারণ, ছোটবেলা থেকে এ পেশাই তাঁর নেশা, এটাই তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।  

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রেসক্লাব মার্কেটের এক কোণে বিদ্যুতের খুঁটির পাশে পত্রিকা গুছিয়ে রাখছেন মঞ্জু। এক হাতে পত্রিকার বান্ডিল, অন্য হাতে ক্রেতাদের জন্য কাগজ আলাদা করছেন। শহরের কর্মব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই জমে ওঠে তাঁর দিনের কাজ।

রংপুর প্রেসক্লাবে নিয়মিত আসা প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলাম জানান, “মঞ্জুকে তাঁরা অনেক বছর ধরে দেখে আসছেন এবং চেনেন। ভোর হলেই সে প্রেসক্লাব এলাকায় চলে আসে। পত্রিকা নিয়ে বিক্রি শুরু করেন। সময় বদলেছে, মানুষের খবর পড়ার ধরন বদলেছে, কিন্তু মঞ্জুর পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ বদলায় নি”।

তরুণ সাংবাদিক রাশেদ হোসেন রাব্বি জানান, “অনলাইনের কারণে ছাপা পত্রিকার বাজার আগের মতো নেই, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মঞ্জুর মতো মানুষ এখনো এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। তাঁদের জীবনসংগ্রাম শুধু একজন পত্রিকা বিক্রেতার গল্প নয়, বদলে যাওয়া সময়ের মধ্যেও টিকে থাকার গল্প। প্রেসক্লাব এসে মঞ্জু না দেখলে এখন নিজেকেই খারাপ লাগে”।

মঞ্জুর মা আনোয়ারা বেগম জানান, ‘মঞ্জু ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছে। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার দেখাশোনার সব দায়িত্ব ওর কাঁধে। এখন আগের মতো আয় আর হয় না। যা আয় করে, তা দিয়েই আমার ওষুধ, খাবার আর সংসারের খরচ চালায় মঞ্জু। অনেক সময় নিজের জন্য কিছু না কিনে আমার প্রয়োজনটা আগে মেটান। আল্লাহ যেন ওকে সুস্থ রাখে, এই দোয়াই করি। ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই।’


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ