১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

ইয়াবা, রংপুরে হত্যাকাণ্ড এবং হাজারো প্রশ্ন

আপলোড সময় : ০১-০৯-২০২৬
ইয়াবা, রংপুরে হত্যাকাণ্ড এবং হাজারো প্রশ্ন ফারজানা হুসাইন

রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে হত্যার ঘটনা নিয়ে প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। পুলিশ ইতোমধ্যে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

দ্রুতগতিতে দুজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের প্রশংসা হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটছে উল্টোটা। সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুলিশের বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ এমনকি পুলিশের পুরো ঘটনার বিবরণকে ‘সাজানো নাটক’ বলেও অভিহিত করছেন।

ফেসবুকে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে অসংখ্য প্রশ্ন। সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা প্রশ্ন এবং নিজের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কিছু প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরাই উদ্দেশ্য।

ইয়াবা সেবনের জন্যই কি ছাদে গিয়েছিলেন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ একই এলাকার বাসিন্দা এবং গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী। ঘটনার রাতে তারা ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে যান। শেষ রাতে বা ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান। এত সকালে তারা সেখানে কী করছেন; এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাদেরও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে আসামিদের জবানবন্দির বরাতে জানিয়েছে পুলিশ। পরে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢোকেন। গণপতি চক্রবর্তীর ১২ বছর বয়সী ছেলে ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য। পুলিশ আরও জানিয়েছে, চার জনকে হত্যার পরও তারা কয়েক ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করেন। ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা খান, গোসল করেন, আগুন জ্বালিয়ে স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করেন এবং টাকা ও গহনা নিয়ে পরে সেখান থেকে চলে যান।

এই বর্ণনা অনেকের কাছেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। আমারও প্রশ্ন আছে, চার জনকে হত্যা করার পর তারা সেখান থেকে পালিয়ে না গিয়ে কেন বাড়ির ভেতরে গেলেন? যদি মূল উদ্দেশ্য শুধু ইয়াবা সেবন এবং ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে হত্যার পরও বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা থাকার প্রয়োজন কী ছিল?

ছাদটাই কেন

আরেকটি প্রশ্ন, ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদই কেন বেছে নেওয়া হলো? অনেকে বলছেন, ইয়াবা সেবনের জন্য খোলা ছাদের চেয়ে নির্মাণাধীন বাড়ির অন্য কোনও জায়গা বেশি উপযোগী হতে পারে। কারণ, ইয়াবা সেবনের প্রচলিত একটি পদ্ধতিতে অ্যালুমিনিয়ামের কাগজে ট্যাবলেট রেখে নিচ থেকে আগুন দেওয়া হয়। খোলা জায়গায় বাতাস থাকলে এভাবে সেবন করা কঠিন হতে পারে।

পুলিশ অবশ্য আসামিদের জবানবন্দির বরাতে জানিয়েছে, তাঁরা ছাদের পানির ট্যাংকের পেছনে বসে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।

শুধু ইয়াবা, নাকি অন্য মোটিভ

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াই কারণ কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

পুলিশ জানিয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির জমি কেনা হয়েছিল দুই অভিযুক্তের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। জমির শরিকরা টাকার সমান ভাগ পাননি; সেখান থেকেও বিরোধের সূত্র তৈরি হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে দাস ও চক্রবর্তী পদবির আড়ালে সনাতন সমাজের গোত্র ও শ্রেণি বিভাজনজনিত কোনও অনুচ্চারিত দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তাধীন একটি ঘটনায় কোনও সম্ভাবনাকেই এখনই চূড়ান্ত সত্য বলা যায় না। একইভাবে কোনও সম্ভাবনাকে অমূলক বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমার প্রশ্ন হলো, ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে দেখে বা চিনে ফেলায় যদি তাঁদের হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে হত্যার পরও সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ কেন দেয়াল টপকে পালিয়ে গেলেন না? বরং তাঁরা বাড়ির ভেতরে গেলেন কেন?

চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য ছিল

পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াবা কেনার জন্য সিদ্ধার্থ ঘটনার রাতে নিজের মোবাইল ফোন এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। আবার তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রীর স্বর্ণালংকার ও টাকা একটি প্রতিবেশীর বাড়ির পেছনের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়েছে।

এই তথ্যগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য নয়, বরং নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য বড় ধরনের চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যেই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন; এমনটা আমার ইনফর্মড ওপিনিয়ন।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ পরস্পরের মামাতো-ফুফাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই। তিনি একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। প্রতিবেশী হওয়ার কারণে কিংবা স্বর্ণের দোকানে কাজ করার সুবাদে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রীর স্বর্ণালংকার সম্পর্কে তাঁর ধারণা থাকা অসম্ভব নয়।

আমার অভিমত, মাদক কেনার টাকা জোগাড়ের জন্য সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে চুরি বা ডাকাতির পরিকল্পনা করে থাকতে পারেন। চার জনকে গামছা বা ছাদে থাকা দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার বর্ণনাও এ ঘটনাকে কোনও পেশাদার হত্যাকাণ্ডের চেয়ে আকস্মিক ও অপরিকল্পিত সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। 

তবে শেষ কথা বলবে তদন্ত। দুই ইয়াবাসেবীর পক্ষে চার জনকে হত্যা সম্ভব? এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সেই রাতে আট থেকে ৯টি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিলেন।

ইয়াবা সেবনের পর মানুষের আচরণে আক্রমণাত্মক প্রবণতা, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, বিভ্রান্তি, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং শারীরিক পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে ট্যাবলেটে মেথামফেটামিনের পরিমাণ, সেবনকারীর শারীরিক সক্ষমতা এবং সে কতদিন ধরে মাদকটি সেবন করছে; এসব বিষয়ের ওপর।

ইয়াবা নিয়ে ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত বিবিসির বাংলার এক প্রতিবেদনে একজন ইয়াবাসেবীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে ওই ব্যক্তি নিয়মিত ইয়াবা সেবন, দীর্ঘ সময় না ঘুমানো এবং পরে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। সুতরাং পুলিশ যে ৮-৯টি ইয়াবা সেবনের তথ্য জানিয়েছে, তা সত্যিই ঘটেছিল কিনা, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এমনটি ঘটার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন

হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের আগমনের পর একজন ইলেকট্রিশিয়ান বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তিনি খুঁটিতে উঠে তার খোলা অবস্থায় দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে আসামিদের ভাষ্য, সিসিটিভি থাকতে পারে; মন আশঙ্কায় তারা বাড়ির নিচের মেইন সুইচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

দুই বক্তব্যের কোনটি সত্য, সেটি তদন্ত করে দেখা জরুরি। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে কেউ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে থাকলে তা হত্যাকাণ্ডের আগাম পরিকল্পনার ইঙ্গিত হতে পারে। আবার বাড়ির মেইন সুইচই যদি বন্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে ইলেকট্রিশিয়ানের বক্তব্যটি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটিও তদন্তের বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও নানা অভিযোগ উঠেছে; মরদেহের মুখ ঝলসানো, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণ করা, দ্রুত মরদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করা এবং পুলিশ পাহারায় থাকা বাড়ির ছাদে পানির মোটর চালিয়ে পানি উপচে পড়ার মাধ্যমে আলামত নষ্ট করার অভিযোগও রয়েছে।

রংপুর পুলিশের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য ও সঠিক তদন্তের জন্য মামলাটি ইতোমধ্যে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সায়েন্টিফিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ আসামিদের ডোপ টেস্টের জন্যও আবেদন করেছে।

পানির মোটরের পানি উপচে পড়ে আলামত নষ্ট হয়েছে, এই অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আলামত সংরক্ষণের জন্য ছাদ তো ঢেকে রাখা হয়নি। বৃষ্টি হলেও ছাদ ভিজে যেতো। তাই পানির মোটরের ওভারফ্লোকে আলামত নষ্টের পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার আগে বিষয়টি আরও যুক্তি দিয়ে বিচার করা দরকার।

তবে পুলিশের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা থেকেই যায়। তদন্তে ঢিলেমি, এখনও ডোপ টেস্ট না হওয়া কিংবা ভুল করে পানির মোটরের সুইচ চালু করে দেওয়া; এসব ঘটনা জনমনে পুলিশের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ