রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডি’সের রেটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল হওয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে গত এক মাসে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন বহুমুখী ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আজকের সংবাদ সম্মেলনে আমি আবারও আপনাদেরকে একটা সুখবর দিতে চাচ্ছি যে, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডি’স (Moody's)-এর রেটিংয়ে বাংলাদেশকে গতকাল নেতিবাচক থেকে একটা লম্বা সময় পর স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরত আনা হয়েছে।
‘অর্থাৎ বাংলাদেশ বর্তমানে বিনিয়োগের জন্য সারা বিশ্বে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগই বাড়বে না, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদাও বাড়বে না; বরং আমাদের ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট—অর্থাৎ নারী, যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য যে কর্মসংস্থান প্রয়োজন, সেটিও একটি ইতিবাচক ধারায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।’
মুডি’স গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের দীর্ঘমেয়াদি রেটিং বি২ অপরিবর্তিত রেখে এর আউটলুক ‘নেগেটিভ’ থেকে ‘স্টেবল’ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক ও বৈদেশিক খাতের তীব্র চাপ কমে আসায় ঝুঁকিগুলো এখন তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, আমরা দেখেছি অত্যন্ত স্বল্প সময়ে তার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গ্যাসের প্রবাহ অনেকটাই বেড়েছে এবং আমরা গ্যাসের যে দৃশ্যমান উন্নয়ন আজ দেখতে পাচ্ছি, সামনের দিনগুলোতে ইনশাল্লাহ সে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।
মূল্যস্ফীতি কমার দাবি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, গত বছরের একই সময় কিংবা গত মাসের তুলনায় দেশের মূল্যস্ফীতি ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে এবং খাদ্যপণ্য ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হারও কমেছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহও তুলনামূলকভাবে ভালো।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং বিশেষ করে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেল তেলের দাম অপেক্ষাকৃত কম। জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি খাতে সরকার সর্বোচ্চ ভর্তুকি দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সাত খাতে সরকারের পদক্ষেপ
মাহ্দী আমিন বলেন, গত এক মাসে নির্বাচিত সরকার যেসব জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো মোটামুটিভাবে সাতটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এগুলো হলো—
১. তারুণ্যের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন;
২. গণমানুষের সার্বিক কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়ন;
৩. নারীর অগ্রযাত্রা, সর্বজনীন কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা;
৪. পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল শিল্পায়ন;
৫. আধুনিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য;
৬. যোগাযোগ অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; এবং
৭. প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ কোটি টাকার ঋণ তহবিল
মাহ্দী আমিন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় গত এক মাসে ৫০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিলের মাধ্যমে দেশব্যাপী উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি চালু হয়েছে। এর অধীনে প্রতিবছর ৫ হাজার সম্ভাবনাময় তরুণকে প্রারম্ভিক মূলধন সহায়তা দেওয়া হবে।
কোনো জামানত ছাড়াই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল চ্যানেলে সুদমুক্ত ই-লোন সুবিধা চালু করা হচ্ছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত তরুণদের জন্য দেশব্যাপী অনলাইন স্টার্টআপ তহবিলের সুযোগ উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
তরুণ উদ্ভাবকদের বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে জাতীয় ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সাইবার সুরক্ষায় দেশে সাইবার ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম এবং জাতীয় আইসিটি ও সাইবার সিকিউরিটি রেটিং সিস্টেম কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কারখানায় সাশ্রয়ী আধুনিক স্মার্টফোন উৎপাদনে বিশেষ নীতিগত প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ কোটি মানুষকে সুবিধার আওতায় আনতে কৃষি শ্রমিক, কৃষক ও রিকশাচালকসহ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জন্য স্মার্টফোনের কার্যকর মূল্য ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার প্রাথমিক লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৪৫ লাখ মানুষকে বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা দিতে দেশব্যাপী আধুনিক ‘আলফা’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সার্ভিস সেন্টার উদ্বোধন ও তিনটি প্ল্যাটফর্ম চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
কক্সবাজারে সমুদ্রসম্পদ ও ব্লু ইকোনমি গবেষণায় বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় প্রতিবছর ৫ শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থীকে শতভাগ সৌদি সরকারি শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কওমি ও আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে বিনামূল্যে সুষম দুপুরের খাবারের রূপরেখা প্রণয়ন চলছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে ঘোষিত ১৫ অনুশাসন বাস্তবায়ন এবং বছরব্যাপী খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।