২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​প্রত্যাশিত ও প্রশংসিত পররাষ্ট্রনীতি

আপলোড সময় : ২০-০৯-২০২৬
​প্রত্যাশিত ও প্রশংসিত পররাষ্ট্রনীতি আবদুল্লাহিল মাসুদ

আবদুল্লাহিল মাসুদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সংবিধানে ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি,  নিরাপত্তা ও সংহতি প্রসারে পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি গুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জাতীয় সমতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।  বিগত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনকালে সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের ধারাটি উপেক্ষিত ছিল। বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল নতজানু এবং ভারত নির্দেশিত পথে পরিচালিত। বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা মিডিয়ার সামনে প্রায়শই বলতেন ‘‘ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা মনে রাখবে’’ অন্যদিকে শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মমেন বলেছিলেন ‘‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার আমি ভারত সরকারকে সেটি করার অনুরোধ করেছি’’। তিনি বলেছিলেন ‘‘ আমি ভারতে গিয়ে মোদিকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ’’। তিনি আরো বলেছিলেন ‘‘ভারতের সাথে আমাদের স্বামী- স্ত্রী সম্পর্ক’’। শেখ হাসিনার শাসনকালে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপদ সীমার মধ্যে অতিক্রম করেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য আমদানি -রপ্তানি ছিল অসম সব ক্ষেত্রেই ভারতকে প্রাধান্য  দেয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, মান -মর্যাদা সব ক্ষেত্রেই ভারতমুখী নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। দেশ তখন একটি বিপদজ্জনক ও অস্থির সময় পার করছিল। বাংলাদেশ ছিল ভারতের কাছে তুচ্ছ -তাচ্ছিল্যের বিষয়। 

জুলাই বিপ্লবের পর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়নের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দ্রুত পরিবর্তন হয়। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ পুনঃজীবিত হয়। 

সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পরিবর্তন আসে। পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়  দেশের স্বার্থে অর্থনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। 

আগস্ট ২০২৪ সালে ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে ইন্টেরিম গভমেন্ট সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের শুভ সূচনা হয়। 
বাংলাদেশের ক্রিকেটের জনপ্রিয় বোলার কার্টার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স আইপিএলে খেলার জন্য দলে ভিড়ায়। মোস্তাফিজকে কে কে আর থেকে বাদ দেয়ার জন্য ভারতের উগ্রপন্থি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী গুলোর পক্ষ থেকে হুমকি দেয়া হয়। যে কারণে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বি সি বি আই) কেকেআর, ফ্রাঞ্চাইজিকে  তাদের চুক্তি থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দেয়। সেইম কারণে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা জনিত কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর  ভ্যানু পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় খেলার প্রস্তাব করে। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের একগুঁয়েমি মনোভাবের কারণে বাংলাদেশ সরকার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একচেটিয়া মোড়োলিপনার প্রতিবাদে  বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে জনগণ স্বাগত জানায়। মূলত এখান থেকেই ভারতঘেষা পররাষ্ট্রনীতি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা মনোভাবাপন্ন পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তন দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। 

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইন্টেরিম গভমেন্টের অধীনে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্টু  নিরপেক্ষ নির্বাচনে  নিরঙ্কশ ও ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি ২০৯ টি আসনে বিজয় লাভ করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এই সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে বিশ্বমানের কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব  ড.মোঃ খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় আধিপত্যবাদের  অবসান :
পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে,  বিগত ১৫ বছর অর্থাৎ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মইন- ফখরুদ্দিনের সেনাসমর্থিত অনৈতিক, অসাংবিধানিক, অস্বাভাবিক  সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা  গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রনীতি ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ছিল ভারততোষণ পররাষ্ট্রনীতি। ভারতের নির্দেশে ও পরামর্শ মোতাবেক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতো। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে যা ছিল অত্যন্ত  ন্যাক্কারজনক ও অপমানজনক। 

আমার এই অনুমানটি ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা, আব্দুল মোমেন, আবুল হাসান, মোহাম্মদ আলী, ডাক্তার দীপু মনি, ওবায়দুল কাদের সহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ  নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০০৮ সালের পর ৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিবেশি একটি দেশের সাথে আমাদের সকল চুক্তি ছিল  অনৈতিক, অশালীন, অসম  বৈষম্য যুক্ত ও রাষ্ট্র বিরোধী । বাণিজ্যিক চুক্তি গুলো ছিল ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনৈতিক, বিমাতা সুলভ। 

শেখ হাসিনার শাসনকালে ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (MOU) এবং বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে অসন্তোষ, তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা হয়েছিল। সমালোচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিশেষকরে বিএনপির নীতি নির্ধারনী ফোরামের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিাবাদ জানিয়ছিলেন  সাবেক প্রধানমন্ত্রী ,দেশনেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও  তারেক রহমান । ৫ আগস্ট ২০২৬ এর পর অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পক্ষ থেকে এই চুক্তিগুলোর প্রায় সব কটিকেই অসম, একপাক্ষিক, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বৈষম্যমূলক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। 

ট্রানজিট ও রেল করিডোর চুক্তি :
২০২৪ সালের জুন মাসে শেখ হাসিনা দিল্লি সফরে গিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভিতর দিয়ে ভারতকে রেল করিডোর প্রদানের জন্য একটি বড় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এই স্মারকের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রেন বাংলাদেশের উপর দিয়ে সরাসরি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসাম, ত্রিপুরা যাতায়াত সুযোগ লাভ করে। দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমালোচক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে এটি কোন সাধারণ ট্রানজিট ছিল না । এটি ছিল শর্তহীন করিডোর প্রদান। এর ফলে বাংলাদেশের সার্বোভৌমত্ব , নিরাপত্তা অস্থিত্ব, ঝুঁকি ও হুমকির মুখে পড়ার নিশ্চত আশঙ্কা তৈরি হয়। এই চুক্তিতে বাংলাদেশ তো লাভবান হয়নি বরং  নেপাল-ভুটানের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এই চুক্তির সমকক্ষ কোন রেসিপ্রোকাল (Reciprocal ) বা কোন সুবিধা আদায় ভারতের কাছ থেকে করতে পারেনি। 

ভারতের সাথে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ চুক্তি ২০১৭ :
২০১৭ সালে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDP)  ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গড্ডা প্ল্যান্ট থেকে ২৫ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি স্বাক্ষর ক্ষেত্রেও বৈষম্য দৃশ্যমান। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (NRC), রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এবং বিদ্যুৎখাতের বিশেষজ্ঞ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই চুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বলেছেন -আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ একপাক্ষিক ও অত্যন্ত চড়া মূল্যে এ চুক্তিটি করা হয়েছিল । বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০% বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা এবং বিদ্যুৎনা দিলেও শতভাগ ক্যাপাসিটি চার্জ ও কয়লার চড়া মূল্য দেওয়ার শর্তে বাংলাদেশকে এক চরম লোকসানের দিকে ঠেলে দিয়ে পুরো সুবিধা আদানি গ্রুপকে দেওয়া হয়। এই চুক্তির ফলে শেখ হাসিনা , ছেলে জয় তার পরিবার ও কতিপয় মন্ত্রী বিরাট অনৈতিক কমিশন লাভের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।

ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার চুক্তি ২০১৯ : 
২০১৯ সালে ভারত প্রেমিক,ফ্যাসিস্ট  শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রূম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারে ভারতকে অনুমতি দিয়ে একটি সমঝোতার স্মারক সই করে। স্বাধীনতার পর থেকে অধ্যাবদি বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা বা পানি বন্টন চুক্তি অনুযায়ী পানি আদায়ের দাবি জানিয়ে বহুবার ভারতের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক করে কোন সমাধান করতে পারছেনা।  ভারত দীর্ঘ কয়েক দশক যাবত তা ঝুলিয়ে রেখেছে। তিস্তার কোন সমঝোতা না করেই একতরফা ভাবে ভারতকে ফেনী নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া দেশের স্বার্থবিরোধী।

উপকূলীয় নজরদারী ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার চুক্তি ২০১৯:
২০১৯ সালে বাংলাদেশের উপকূলে একটি যৌথ রাডার নেটওয়ার্ক বা নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই সাথে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য আমাদের দেশের মংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর অবাধ ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। দেশের সংবেদনশীল উপকূলীয় এলাকায় অন্য দেশের রাডার ব্যবস্থা স্থাপন জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ , সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃত্ববৃন্দ মত প্রকাশ করেন। এই চুক্তিটিতে বন্দর ব্যবহারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে ভারতের কৌশলগত সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। মূলত এ চুক্তিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধা দুটি বড় ক্ষেত্রে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। অন্যদিকে ভারত সেভেন সিস্টার্স রাজ্য গুলোর নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে একচেটিয়া সুবিধা লাভ করেছিল।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমযোতা স্মারক ২০১৭ :
২০১৭ সালে ভারত প্রেমিক ও ভারতের মদদপুষ্ট শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সাথে একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা  ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষর করে। 
যার অধীনে ভারতকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সামরিক ঋণ (Line of credit ) সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। যা দিয়ে বাংলাদেশ কেবল ভারত থেকেই সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারবে ।বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের স্বাধীনতা এই চুক্তির মাধ্যমে সীমিত করা হয়এবং  কৌশলগতভাবে বাংলাদেশকে ভারতের উপর নির্ভরশীল বা জিম্মি করা হয় । জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সংবাদ ও মাধ্যম ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদরা ভারতের সাথে এই চুক্তিকে সার্বভৌমত্ব বিরোধী তথাকথিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক ২০১৭ এর তীব্র নিন্দা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান ।এই নেক্কারজনক চুক্তিএগুলোর সবই ছিল ভারতের পক্ষে একচেটিয়া ও লাভজনক। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের জন্য ছিল অসম ও হুমকি স্বরূপ । বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ছিল অলাভজনক,  ঝুঁকিপূর্ণ ও চরম ক্ষতিকর। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার প্রশংসিত পররাষ্ট্রনীতি ২০২৬: 
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনাব তারেক রহমান তাঁর প্রথম সফর  হিসেবে ভারতকে বেছে নিবেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল । ভারতের গণ ও সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে ফলাও করে বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরটি ভারত থেকেই শুরু করতে যাচ্ছেন। এমনও বলা হচ্ছিল তিনি ভারতের সাথে সমঝোতা করে এসেছে। একটি অলিখিত সমঝোতা করণেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন। ফলে দেশের কেয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতা কর্মী একশ্রেণীর সুশীল সমাজ ও ভারতীয় দালালদের  নিশ্চিত প্রত্যাশা ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত কে দিয়েই তার প্রথম বিদেশ সফরটি শুরু করতে যাচ্ছেন। সকল জল্পনা -কল্পনাকে মাটি দিয়ে তারেক রহমান মালয়েশিয়া দিয়েই তাঁর প্রথম বিদেশ সফ শুরু করেন ২০২৬ সালের একুশে জুন । ২১  ও ২২ শে জুন দুই দিনব্যাপী মালয়েশিয়া সফর করে ২৩ জুন তিনি কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যান চীন  সফরের উদ্দেশ্যে । প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া ছিল তাঁর প্রখর মেধা শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত- চীন বিতর্ক এড়াতে এবং ভারতকে  একটি স্পষ্টবার্তা দিতে , জনমনে ভারতকে নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া ছিল সেটাকে গুরুত্ব ও সম্মান দিতে তিনি প্রথম মালয়েশিয়া পরবর্তীতে চীন সফর করেন। তারেক রহমানের পারিবারিক ঐতিহ্য বিবেচনা করলে তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর ছিল চীন দেশে । ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম চীন সফর যান তবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়েনমার তৎকালীন (বার্মা)। বিএনপি চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী মাদার  অব ডেমোক্রেসি দেশনেত্রী এবং খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের জনগণের  ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিদেশ সফর ভারত হলেও তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম সফর করেন সৌদিআরবে। 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রখর মেধা সম্পন্ন দেশের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, ভারতের প্রভুসুলভ আচরণ ও মনোভাবের প্রতি অসন্তুষ্ট তারেক রহমান পিতা ও মাতার পথ অনুসরণ করেই  প্রথম বিদেশ সফরে কোন দেশে যাবেন সেটি নির্ধারণে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন না। ফলে তার প্রথম ও দ্বিতীয় বিদেশ সফরের দেশ দুটিকে বাছাই করা যে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ছিল বিদেশ সফর পরবর্তী জনসন্তুষ্টি থেকে তা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সফরের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিছু পর্যবেক্ষণ, ভারতের হাসিনা  প্রীতী ও ওসমান গনি হত্যাকারীকে বাংলাদেশে ফেরত না পাঠানো ভারতের মাটি ব্যবহার করে খুনি হাসিনার বাংলাদেশ বিরোধী কথাবার্তা, ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত  বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য প্রচারে বাংলাদেশের জনগণ ত্যক্ত ও বিরক্ত ছিল । তারপরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লী সফরে নেয়ার জন্য ভারত  মরিয়া হয়ে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে । ভারতের  বেশ কয়েকজন কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইউটিউবার এবং সংবাদ ও গণমাধ্যমের বিশেষ তৎপরতা লক্ষণীয়। তারা গত আগস্ট মাসে (২০২৬) দিনক্ষণ তারিখ নির্ধারণ করে বলা শুরু করেছিল  ২১ এবং ২২শে আগস্ট ( ২০২৬) তারেক রহমান নিশ্চিত  ভারতে আসছেন । পরবর্তীতে আবারো বলা হলো ২৩-২৫ আগস্ট (২০২৬) তারেক রহমান দিল্লী আসছেন । আগস্ট মাসের শুরুর দিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ে একটি ইমেইল দ্রুত বাংলাদেশের মানুষের ,কূটনৈতিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গদের নজর কাড়ে। এই ইমেইলে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানোর মহড়ার কারণে রাষ্ট্রপতি ভবনের সাপ্তাহিক ‘‘চেঞ্চঅবগার্ড’’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। অথচ সেই সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোন তথ্য প্রকাশ বা ঘোষণা দেয়া হয়নি।

পরে  অবশ্য এক ঘন্টার মধ্যে  এই ইমেইলটি প্রত্যাহার করা হয়। তবে এই ইমেইলটি তারেক রহমানের দিল্লি সফর  নিয়ে ভারতের প্রবল আগ্রহ এবং অত্যন্ত স্বল্প ও  দ্রুত সময়ে তারেক রহমানকে দিল্লিতে পেতে  ভারতের মরিয়াভাব প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আনতে ভারতের প্রাণন্তকর মরিয়া প্রচেষ্টা  আন্তর্জাতিক কূটনীতি  পাড়ায় ব্যাপক কৌতুক ও হাস্যরসের সৃষ্টি করে। দিল্লির প্রবল উস্কানি সত্ত্বেও  তারেক রহমান এখন পর্যন্ত দিল্লি সফরের কোন সিদ্ধান্ত নেননি। ভারতের আমন্ত্রণ অনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বিবিসিকে জানান, ভারত সফরের ব্যাপারে এখনো কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।  নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র- জনতার সফল গণ অভ্যুত্থানে শেখ  হাসিনার পতনের পর ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়  দুই দেশের সম্পর্কের চরম বিদ্বেষ ও টানাপড়ন তৈরী হয়।  দিল্লি এখন সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিএনপি সরকারের সাথে আলোচনা করতে প্রবল আগ্রহী।  তবে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার অবস্থান, বাংলাদেশ  সরকার বিরোধী কথাবার্তা, বিদেশি মিডিয়াতে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার,ই-মেইল বার্তা ভারতের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে  বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা ভারতে পলায়নের পূর্বে অভ্যুত্থানের সময়ে আইনশৃঙ্খলা  বাহিনীকে বল  প্রয়োগ করে, গুলি করে ছাত্র হত্যা নির্দেশ দেয়ার দায়ে  বিশেষ  ট্রাইবুনাল অভিযুক্ত ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের নতুন সরকার। শুধু শেখ  হাসিনা নয় সুনিদিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ সকল আসামিকে  দেশে ফেরত পাঠাতে দাবি জানিয়েছে বর্তমান সরকার। 

প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বলা হয়েছে ভারতকে অনুকূল  পরিবেশ তৈরি করতে। হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে সরকার।
অন্যদিকে ভারত  বাংলাদেশকে হাইকোর্ট  দেখাচ্ছে। বলছে তারা প্রত্যাবর্তন অনুরোধটি বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের জনগণের প্রবল প্রত্যাশাকে গুরুত্ব না  দিয়ে দিল্লি ঢাকার  সাথে সম্পর্ক মেরামত করতে তারেক রহমানকে তোষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। দফায় দফায় বৈঠক করে ‘‘ছেলে  ভোলানোর’’ ছড়া মতো কথা বলছে। আগেই বলেছি যে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতীয় হাই কমিশনার দানেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীসহ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। দীনেশ ত্রিবেদী জানান তারেক রহমান দিল্লি গেলে তাঁকে  সর্বোচ্চ সম্মাননা , স্মরণীয় সংবর্ধনা ও অভ্যর্থনা জানানো হবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শ্যারণ বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হাসিনাকে সরাসরি ঢাকায় ফেরত পাঠানো ছাড়া ঢাকাকে কাছে টানতে দিল্লি সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।  যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত ও নিশ্চিদ্র করা,  বাংলাদেশের মেডিকেল ভিসা প্রদান অব্যাহত রাখা। বাংলাদেশ-ভারত দু'দেশের মধ্যে ৪হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি দ্বিপাক্ষিক  বাণিজ্যি যার বেশির ভাগই ভারতের অনুকূলে। এছাড়া ভারতের  উত্তর- পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ৫ আগস্ট ২০২৬ দিল্লিতে সাউথ এশিয়ার করেন্সপন্ডেন্স  ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে হাসিনার ভার্চুয়াল  বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।  ঢাকার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ভারত সরকারের সরাসরি অনুমোদন  ও অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিদ্বেষী বক্তব্য প্রদান করেছে পলাতক হাসিনা।

ঐ অনুসন্ধানে পলাতক  হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত  করে তারেক রহমানের নির্বাচনী নতুন সরকারের  বিরুদ্ধে বিষাদগার করেন। এতে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়  থেকে কঠোর ভাষায় ক্ষোভ  ও প্রতিবাদ জানানো হয় দিনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে  দিল্লিকে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে  এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে অত্যন্ত নেককারজনক ও নেতিবাচক বার্তা দেয়। দিল্লি  বাংলাদেশের  সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আদৌ আন্তরিক  ইচ্ছা পোষণ করে কিনা তা  এখন প্রশ্নবিদ্ধ। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানকালীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর তাঁর  জন্য বিব্রতকর এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্বস্তিকর ও   ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান  ও চীনের সাথে সম্পর্ক পুনঃগঠন  করছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সাথে উচ্চ পর্যায়ের সামরিক  বৈঠক হয়েছে। চীনের সাথেও একই পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। এই দুটি দেশের সাথে বাংলাদেশের অতিমাত্রায় সুসম্পর্ক  ভারত ভালো চোখে দেখছে না। অতিসম্প্রতি মক্কা জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামরিক   চুক্তি বা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।  সৌদি আরব তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপাক্ষীয় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি হলো মক্কা চুক্তি। সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল বিষয় হলো ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ এর আদলে এই চুক্তিতে বলা হয়েছে স্বাক্ষরিত তিন দেশের (সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক) যেকোনো  একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ  হলে সেটি  চুক্তিভুক্ত তিন দেশের সবার উপর আক্রমণ বলে গণ্য করা  হবে। সদস্য দেশগুলোর  ভূমিকার মধ্যে সৌদি  আরব প্রতিরক্ষা প্রকল্প ও কার্যক্রমে  আর্থিক সহায়তা ও তহবিল  যোগাবে। তুরস্কর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং  অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম  প্রতিরক্ষা  সরবরাহ করবে। পাকিস্তান সামরিক  শক্তি ও নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়ে সহ সহযোগিতা করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর সহযোগিতাকে আরও সুসংহত  করতে একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি   এবং একটি সচিবালয় গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,যার  প্রথম সচিবালয় পাকিস্তানে  নির্ধারণ করা হয়েছে।  

চুক্তির পেছনের কারণ: 
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক  উত্তেজনা এবং নিরাপত্তার  নতুন সমীকরণের অংশ হিসেবে এই জোট গঠন করা হয়েছে। মূলত বাইরের  কোন একক শক্তির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা  কমিয়ে নিজেদের কৌশলাগত স্বায়ত্বশাসন   ও যৌথ  প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্যই এই তিন দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সৌদি আরব ২৪ শে আগস্ট মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে অন্তভুক্ত হতে  বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রয়টার্স সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক  গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের  বরাতে  এই তথ্য প্রকাশ পায়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী  হুমায়ুন কবীর সংবাদ মাধ্যমকে  জানান যে, জোটের সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই জোটে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ  জানিয়েছে। বাংলাদেশ এই জোটের বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন যে, মক্কার জোটে যোগ দেয়ার জন্য এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত আমন্ত্রণ পায়নি। তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে এ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা ও ইঙ্গিত রয়েছে। সরকার জানিয়েছে যদি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায়,তবে দেশের জাতীয়  স্বার্থ ও  নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা  করে বাংলাদেশ এতে যোগ দেয়ার বিষয়টি পজিটিভলি মূল্যায়ন করবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী  হুমায়ুন কবিরও একই রকম মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন মুসলিম দেশগুলোর এমন নিরাপত্তা জোটে  অংশ নেয়ার বিষয়টি তারা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে অর্থনৈতিক, কূটনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ কিছু সুবিধা পাবে।
ক. অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের সুবিধা: সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার আরো নিরাপদ ও প্রশস্থ হবে।  রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

খ. প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন:- তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং সৌদি -পাকিস্তানের সামরিক শাক্তির সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

গ.অস্ত্র আমদানির বৈচিত্র : অস্ত্র আমদানির উৎস এবং ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাবে। 
ঘ. কূটনৈতিক দরকষাকষি ও ভূ-রাজনীতি : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের দর কষাঘষির ক্ষমতা (delomatic  leverage)  বৃদ্ধি পাবে। একটি প্রধান মুসলিম দেশের সাথে যৌথ  নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কাঠামোর সাথে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর  সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।  পারস্পরিক সম্পর্ক আরো নিবিড় ও গভীর হবে। 

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের উপর নির্ভরশীল ছিল। ভারতের পরামর্শে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারিত হতো। কোন দেশের সাথে সম্পর্ক গড়লে ভারত লাভবান হবে বা খুশি থাকবে তার উপর  ভিত্তি করে বাংলাদেশের কূটনীতি পরিচালিত হতো। সেই কারণে তুরস্ক পাকিস্তান সহ বেশিরভাগ মুসলিম দেশের সাথে বাংলাদেশের তেমন কোন সম্পর্কছিলনা। বিশেষ করে প্রযুক্তির দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শীতল। ভারতের ক্রমাগত আপত্তির কারণে চীনের সাথে বাংলাদেশের  সম্পর্ক থাকলেও উন্নয়নের অংশদাড়িত্বের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত দুর্বল। 

শেখ মুজিবের শাসন থেকে শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনে ভারত শুধু নিজের স্বার্থে বাংলাদেশের কাছ থেকে যা দরকার তারা তাই নিয়েছে।  পক্ষান্তরে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাত ছিল শূন্য। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জনগণের স্বার্থ , সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের দিন-খন নির্ধারণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।  বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশের স্বার্থে  জনগণের সাথে সম্পর্কের পরিবর্তে সম্পর্ক ছিল হাসিনার সাথে মোদির, প্রণব মুখার্জির সম্পর্ক। যার ফলে দেশের পরিবর্তে ব্যক্তি  এবং দল লাভবান  হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হয়েছে।  দেশের সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়েছে। 

হাসিনার সাথে মোদির সম্পর্কের একটি বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ এবং সত্যতা এই লেখাতে বর্ণনা করেছি। ভারতে পলাতক, ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত খুনি হাসিনা গত ৫ আগস্ট (২০২৬) একটি প্রেস কনফারেন্স করলে ভারত -বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ভারত সরকারের অনুমোদন ও সম্মতি ছাড়া শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স করা সম্ভব ছিল না। এই প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করছিল ভারতীয় একটি মিডিয়ার পক্ষ থেকে। হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরীর আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের প্রত্যাশা হচ্ছে ভারতের সাথে সম্পর্ক কেবল সাধারণ সৌজন্যমূলক বা বহুপক্ষীয় কোন সম্পর্ক নয় বরং অর্থবহ ও ফলাফল ভিত্তিক সম্পর্ক হতে হবে। গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন, ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করণ, এবং বাণিজ্যিক বাঁধা দূর করার মত সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা আগে ঠিক করতে হবে। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে দিল্লির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অতি দ্রুত বা তাড়াহুড়া করে সফর  না করে পূর্ব প্রস্তুতি ও সমস্যা চিহ্নিত করে, দাপ্তরিক আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থ ও লক্ষ্য  অর্জনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। মক্কা চুক্তি বা যেকোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশের স্বার্থ নিরাপত্তাই হবে মূল প্রতিপাদ্য। এর আগে এটি ছিল প্রতিবেশী একটি দেশের মত ও ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ গুলির মধ্যে একটি গুরুত্ব অবস্থানে আছে। ভূরাজনৈতিক কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক  সৌদি আরব, ভারত সহ সকল দেশের সাথেই সমান ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোন একটি মাত্র দেশের সাথে বিশেষ  সম্পর্ক স্থাপন করে দেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা,  সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত করে জনগণের ইচ্ছার  বিরুদ্ধে অবস্থান হবে গণতন্ত্র বিরুদ্ধ। যা দেশের ১৮কোটি মানুষের প্রত্যাশা বিরোধী। এই সরকারের পাঁচ বছর ক্ষমতার মেয়াদের ১৮০ দিন বা তার বেশি সময় অতিক্রম করছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্ব মানে উপনীত করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। জনগণের দীর্ঘ প্রত্যাশিত পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮ কোটি মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাই এ কথা বলা যেতেই পারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন জনগণের প্রত্যাশিতেআশা-আকাংক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এবং জনগণ কর্তৃক প্রশংশিত হচ্ছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা পাঁচ বছর মেয়াদী এই সরকার তার পুরো সময়ে জনগণে প্রত্যাশিত  আন্তর্জাতিক কুটনীতির ধারা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশের সম্মান ১৮ কোটি মানুশের প্রত্যাশা, মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখক : কলামিস্ট


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ