০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬ ঘণ্টার তাণ্ডব, টেরই পেলো না পুলিশ?

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬
গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬ ঘণ্টার তাণ্ডব, টেরই পেলো না পুলিশ? রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভবন ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে হামলা চালায়।


রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে ৫০ বছরের পুরোনো মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভবন ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। ভোর পর্যন্ত চলে ভাঙচুর ও লুটপাট। ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও নগদ অর্থ। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি নিজেদের দাবি করে ‘সমমনা ব্যবসায়ী পরিষদ লিমিটেড’-এর ব্যানারও টাঙিয়ে যায় হামলাকারীরা।

নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ সময় পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারেনি; এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ একবার ঘটনাস্থলে এলেও পরে চলে যায়। এরপরই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে হামলাকারীরা।

 

শনিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

যেখানে প্রতিদিন সেবা নিতেন ৩০০-৩৫০ মা ও শিশু

মিরপুর-১ এর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ঠিক পেছনে রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি। বিপরীতে মূল সড়ক, পাশে এপেক্স জুতার শোরুম ও ওপরে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। মার্কেটের ভেতরের সরু রাস্তা ধরে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক দিয়ে মা ও শিশুরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসতেন।

 

স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়া এই কেন্দ্রে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মা ও শিশু সেবা নিতেন। প্রান্তিক পরিবারের গৃহিণী ও শিশুদের জন্য এটি ছিল টিকা ও প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম ভরসার জায়গা। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় সেখানে এখন আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো চিহ্ন নেই। শত শত মানুষের চোখের সামনে টিনের ছাদ থেকে শুরু করে ভেতরের সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। আসবাবপত্র, ওষুধসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল সেখানে আসে। পূর্ব পাশের মূল সড়কে ভেকু রাখা হলেও সেটি ভেতরে ঢোকানো সম্ভব হয়নি। পরে হাতুড়ি, খুন্তিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ভাঙচুর শুরু করে তারা। ভোর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব।

ছয় ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে এমন ভাঙচুর চললেও পুলিশ তা ঠেকাতে পারেনি কেন; এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, শত শত মানুষের সামনে ঘটনাটি ঘটেছে। কারা জড়িত, প্রশাসন তা জানে। তার অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেও সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি দেখে চলে যায়।

তিনি বলেন, এখানে ছোট ছোট শিশুদের টিকা দেওয়া হয়, গর্ভবতী মায়েরা সেবা নিতে আসেন। সাধারণ মানুষ বড় হাসপাতালে যেতে পারেন না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কর্মীরা মমতার সঙ্গে সেবা দেওয়ায় এটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল।

আব্দুল লতিফ বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা বিরল। এখানে হামের টিকাও দেওয়া হতো। তার অভিযোগ, জায়গাটি দখল করে দোকান নির্মাণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের স্বার্থেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, দলীয় লোকজন থেকে শুরু করে প্রশাসন সবাই জানে। এখন ভাঙার পর সবাই যেন সাধু।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আশপাশের কিছু ব্যবসায়ীও ভাঙচুরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করা হয়েছে।

 



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ