১১ অক্টোবর ২০২৬ , ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

খুনের হার ঊর্ধ্বমুখী

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬
খুনের হার ঊর্ধ্বমুখী ছবিঃ সংগৃহীত

এসএম শহীদ উল্লাহ: দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। বছর ঘুরে শরৎকালের শেষ প্রান্তে এসে পুলিশের সর্বশেষ মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান এক নতুন ও স্পর্শকাতর চিত্র প্রকাশ করেছে। গত আগস্ট মাসের তুলনায় সদ্য বিদায়ী সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় ধরনের অপরাধের পারদ কিছুটা উঁচুতে উঠেছে। বিশেষ করে পরিকল্পিত বা পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে নতুন করে ভীতি ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তবে এই হতাশার ভিড়েও কিছু ইতিবাচক সূচক এবং আশার আলো দেখিয়েছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের তৎপরতা।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে অপরাধের খাতায় এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, আগস্ট মাসে সারা দেশে যেখানে মোট খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল ২৮৬টি, সেখানে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯৭টিতে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খুনের ঘটনা ১১টি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু হত্যা নয়, এই মাসে চুরি এবং দ্রুত বিচার আইনের অপরাধও আগের মাসের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আগস্টে চুরির মামলা ৮৩৯টি থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৮৬৫টিতে পৌঁছায়। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ৫২টি থেকে লাফিয়ে সোজা ৮১টিতে গিয়ে ঠেকেছে।

তবে খুনের মতো গুরুতর অপরাধ বাড়লেও সামগ্রিক অপরাধের গ্রাফে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে মোট মামলার পরিসংখ্যান। পুলিশের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগস্ট মাসে সারা দেশে মোট মামলার সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৮৯৬টি। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে তা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৫০টিতে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক মামলার সংখ্যা ২৪৬টি হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট অপরাধ যেমন— ডাকাতি, অপহরণ এবং নারী ও নির্যাতনমূলক অপরাধের সূচক কিছুটা নিম্নমুখী হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক অপরাধের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে খুনের ঘটনায় সবচেয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫০টি খুনের ঘটনা ঘটলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭টিতে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় আগস্টে খুনের মামলা ছিল মাত্র ২০টি, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১টিতে। শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও খুনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। খুলনা রেঞ্জে ২২ টি থেকে বেড়ে ৩১টি, রংপুর রেঞ্জে ১৫টি থেকে বেড়ে ২১টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ২৩টি থেকে বেড়ে ২৭টিতে উন্নীত হয়েছে খুনের মামলা।

তবে এই ঊর্ধ্বগতির বিপরীতে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন—ঢাকা রেঞ্জের অধীন এলাকায় খুনের ঘটনা আগস্টের ৮৬টি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে সেপ্টেম্বরে ৫৩টিতে নেমে এসেছে। অন্যদিকে সামগ্রিক মামলার দিক থেকে বিভাগীয় রেঞ্জগুলোর মধ্যে উভয় মাসেই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা রেঞ্জ এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। তবে সবচেয়ে বড় অঘটনা দেখা গেছে বরিশাল রেঞ্জে। সেখানে আগস্টের ১ হাজার ১১৮টি মামলার বিপরীতে সেপ্টেম্বরে অস্বাভাবিকভাবে ১ হাজার ৫৮৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মূলত মাদক এবং নারী নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার আকস্মিক উল্লঙ্ঘনের কারণেই বরিশাল রেঞ্জে এই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যানেও বেশ কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে। আগস্টে উদ্ধার সংক্রান্ত মোট মামলা ৭ হাজার ৬১৮টি থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার ৫৩৪টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মাদক উদ্ধার মামলা সামান্য কমে ৭ হাজার ১০১টিতে ঠেকেছে। তবে এই হ্রাসের মাঝেই কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে অবৈধ অস্ত্র এবং বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের মামলার সংখ্যা। দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মামলা ১৫৯টি থেকে সামান্য বেড়ে ১৬০টিতে দাঁড়ালেও বিস্ফোরক আইনের মামলা ২৪টি থেকে এক লাফে ৩০টিতে পৌঁছায়।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিস্ফোরক সংক্রান্ত অপরাধের চিত্র এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ডিএমপি এলাকায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়ের করা মামলা আগস্ট মাসের মাত্র ৪টি থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে সেপ্টেম্বরে গিয়ে ঠেকেছে ২০টিতে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বিভিন্ন সময় খোয়া যাওয়া বা লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকের যথাযথ পুনরুদ্ধার না হওয়ায় তা অপরাধীদের হাতে থেকে যাচ্ছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধ চক্রগুলো নানা ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা কঠোরহস্তেই দমন করা জরুরি। সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জে খুন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে খুনের মামলা কিছুটা বেশি মনে হলেও এর পেছনের মূল কারণ আদালতের আদেশে পুরোনো অভিযোগের এফআইআর এবং কিছু বিলম্বিত ও সন্দেহজনক স্বাভাবিক মৃত্যু। এটিকে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলা চলে না। বরং মাঠপর্যায়ের সিংহভাগ ঘটনাই মূলত সামাজিক বা পারিবারিক কলহজনিত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জে কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের রেকর্ড নেই এবং খুন ও ডাকাতি ছাড়া দস্যুতা, গণধর্ষণ ও অপহরণের মতো অপরাধগুলো উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে তিনি আরও জানান, রেঞ্জের ১১টি জেলায় দিন-রাত প্রায় ১ হাজার ১০০টি মোবাইল পুলিশ টিম নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ অপরাধী গ্রেপ্তারের হার বর্তমানে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে দৈনিক গড়ে মাত্র ২৫০ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দৈনিক এক হাজারের বেশি জনে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার সংক্রান্ত মামলার হার ৫০ শতাংশ এবং মামলা নিষ্পত্তির হার প্রায় ১০ শতাংশ উন্নত হয়েছে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই অগ্রগতি আরও সুদূর প্রসারী হবে বলে তিনি আশাবাদী।

দেশজুড়ে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বহুমুখী কারণ দেখছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন সংকটের কারণে অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা এখনও মনে করছে যে পুলিশ হয়তো আগের মতো কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়ে ওঠেনি। তাই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে পুলিশকে মাঠপর্যায়ে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা, পূর্ণ মনোবল ও দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীদের মনে আইনের কঠোর শাসন ও ভীতি তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের সময় থানা বা বিভিন্ন স্থান থেকে লুট হওয়া প্রচুর পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র এখনও পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অস্ত্রগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে মাদকের অবাধ ও সহজলভ্যতা বজায় থাকলে কোনোভাবেই অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই মাদকের মূল উৎস ও সরবরাহ চক্র যেকোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

তাছাড়া আইনি প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তার অভাবের কারণে অপরাধীরা সহজেই জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে—এমন শঙ্কার কথাও তিনি ব্যক্ত করেন। উপযুক্ত সুরক্ষার অভাবে সাক্ষীরা আদালতে মুখ খুলতে ভয় পান। তাই সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রেখে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একসঙ্গে বসে আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত তা সমাধানের পথ বের করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ