ছবিঃ সংগৃহীত
বাইরে থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা সহজ, কিন্তু এর ভেতরের কঠিন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল একজন প্রাথমিকে কর্মরত শিক্ষকই জানেন—ঠিক কতটা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে প্রতিদিন আমাদের ক্লাসরুমে পাঠদান চালাতে হয়।
১. মানসিক ও পারিবারিক নাজুকতা: আমাদের বিদ্যালয়ের প্রায় ১০% থেকে ২০% শিক্ষার্থীর পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কারও বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে, কারও বাবা ছেড়ে চলে গেছে, আবার কারও মা তাদের ফেলে চলে গেছে।
এই শিশুগুলোর একটি বড় অংশ বেড়ে উঠছে বৃদ্ধ দাদি, নানি কিংবা খালার আশ্রয়ে। পরম মমতার বদলে তাদের দিন কাটে চরম মানসিক শূন্যতায়। একটি কোমলমতি শিশু যখন পারিবারিক ভাঙন ও অবহেলার ট্রমা বয়ে বেড়ায়, তখন তার মানসিক অবস্থা কতটা নাজুক হতে পারে—তা একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক ছাড়া অন্য কারও পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
২. আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও অসচেতনতা: পারিবারিক ভাঙনের পাশাপাশি যুক্ত হয় তীব্র দারিদ্র্য। অধিকাংশ অভিভাবক নিরক্ষর কিংবা শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অসচেতন। বাড়িতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার তদারকি করার মতো কেউ নেই; এমনকি বিদ্যালয়ে আসার মতো ন্যূনতম প্রস্তুতি ও আবেগিক সাপোর্টও শিশুরা বাড়ি থেকে পায় না।
৩. শিক্ষকের বহুমাত্রিক ভূমিকা: এ ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে আসা শিশুদের কাছে আমরা শিক্ষকরা কেবল নির্ধারিত সিলেবাসের “শিক্ষক” নই। পাঠদানের পাশাপাশি তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে ওঠার সাহস দিতে হয়, মা-বাবার মমতা দিয়ে তাদের আগলে রাখতে হয় এবং শিক্ষার মূলধারায় ধরে রাখতে তাদের সচেতন করতে হয়। শূন্য থেকে শুরু করে একটি শিশুকে তৈরি করার এই যে অদৃশ্য লড়াই, তা সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো পরিসংখ্যানের খাতায় দেখা যায় না।
৪. চ্যালেঞ্জ ও আমার দৃঢ় অঙ্গীকার: যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা কিন্ডারগার্টেন নিয়ে প্রতিনিয়ত তুলনা করা হয়, তাদের শিক্ষার্থীরা মূলত সচেতন, শিক্ষিত এবং সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তান—যাদের পেছনে গৃহশিক্ষক ও পরিবারের সার্বিক সহযোগিতা থাকে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিকে আমরা যে বৈচিত্র্যময়, সুবিধাবঞ্চিত ও পারিবারিক ভাঙনের শিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করি, তাদের মানসিক ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি আমাদের চেয়ে ভালো ও স্থায়ী শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে—তবে আমি নিজের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেবো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু অক্ষরজ্ঞান দান করেন না; বরং ভাঙাচোরা পরিবার থেকে আসা পথহারা শিশুদের মেধা, নৈতিকতা ও সঠিক মানসিক গঠনে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন—এই বাস্তব সত্যটি সমাজকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে।