রাজশাহীতে ৩৫, সারাদেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং
সংগৃহীত ছবি
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, রাজশাহী : রাজশাহী মহানগরীসহ সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে এসব চক্রের সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগরীতে অন্তত ৩৫টি কিশোর অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। অন্যদিকে, সারাদেশে পুলিশের তালিকায় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অপরাধী চক্রের বিস্তারের পেছনে কিশোরদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, অপরাধ দমনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগও জরুরি হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী নগরীর বাকির মোড়ে টাকা ভাঙানো নিয়ে সামান্য বাগ্বিতণ্ডার জেরে এক দোকানদারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করে উঠতি অপরাধীরা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব বিরোধ অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি রয়েছে। পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবির জানিয়েছেন, নগরীতে অন্তত ৩৫টি কিশোর অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের মধ্যে টেন স্টার বয়, রাইজিং বয়, অদম্য বালক, গলি বয়, হিটার বয়েজ ও বুলেট গ্যাংয়ের নাম উল্লেখযোগ্য। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য বিশ্লেষণেও নগরীতে এসব চক্রের সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিচ্যুতি নয়, এর সঙ্গে কাঠামোগত সমস্যাও জড়িত। শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি কিশোরদের প্রতি পরিবারের নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন।
পুলিশের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, সারাদেশে তালিকাভুক্ত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, এসব চক্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে ১৫৯টি, চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, গাজীপুর মহানগরে ১৩টি এবং রাজশাহীতে ১৩টি বড় ক্যাটাগরির গ্যাং রয়েছে।
গত এক বছরে রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮ থেকে বেড়ে ১৫৯টিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এসব চক্রের বিস্তার ঘটেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড এখন আর দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা ছোটখাটো অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানভেদে জমি ও বাড়ি দখল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব অপরাধী চক্রের পেছনে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আবাসন ব্যবসায়ীদের একটি অংশের পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, সারাদেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও কিশোর অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো এবং অপরাধে মদদদাতাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
কমেন্ট বক্স