১৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনায় বাংলাদেশ, নেতৃত্বে শিশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৭-১০-২০২৬
প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনায় বাংলাদেশ, নেতৃত্বে শিশুরা ছবিঃ সংগৃহীত

মাত্র আট বছর বয়সেই ২০০ টাকার উপকরণ দিয়ে চুলার একটি মডেল তৈরি করেছে বগুড়ার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তার দাবি, এক টাকার পেট্রোল দিয়ে এক দিনের রান্না করা সম্ভব। আব্দুল্লাহর মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুরাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ভাবছে নতুন নতুন ধারণা। কেউ তৈরি করছে সৌরবিদ্যুতের মডেল, কেউ কৃষিকাজ সহজ করার প্রযুক্তি, আবার কেউ পরিবেশদূষণ ও জ্বালানি সংকটের সমাধান খুঁজছে।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানমেলায় শিশুদের এসব উদ্যোগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরছে। কোনো প্রকল্প প্রাথমিক ধারণা, কোনোটি পরীক্ষামূলক মডেল, আবার কোনোটি বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা। সব প্রকল্পের কার্যকারিতা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। তবে নিজেরা সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের পথ খোঁজা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার আগ্রহ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানচর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা জরুরি। তবে বিজ্ঞানমেলায় প্রকল্প প্রদর্শনের মধ্যেই বিজ্ঞানচর্চা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের ধারণাকে পরীক্ষা, গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে হবে।

বগুড়ার নিশিন্দারা শৈলারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ শহরের পি স্কুলের শিক্ষার্থী। তার বাবা মোহাম্মদ এনামুল হক গোবিন্দগঞ্জ কামিল মাদরাসার রসায়ন বিভাগের শিক্ষক। সম্প্রতি নিজের বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানমেলায় প্রায় অর্ধশত প্রকল্পের মধ্যে আব্দুল্লাহর তৈরি চুলার মডেলটি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী আব্দুল্লাহ আগেও বিজ্ঞানমেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পেয়েছে। ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় সে।

আব্দুল্লাহ তার প্রকল্পের নাম দিয়েছে ‘এক টাকার পেট্রোল দিয়ে এক দিনের রান্না’। প্লাস্টিকের বোতল, পেট্রোল, পানি, টিনের কৌটা ও বায়ু পাম্প ব্যবহার করে প্রায় ২০০ টাকার উপকরণে মডেলটি তৈরি করেছে সে। তার ধারণা, পেট্রোল ও পানির সাহায্যে বুদবুদের মাধ্যমে গ্যাস তৈরি করে তা চুলায় ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন। আব্দুল্লাহর বাবা ও শিক্ষকরা তাকে বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিচ্ছেন। তাদের আশা, ভবিষ্যতে সে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।

স্মার্ট প্রযুক্তিতে কৃষি ও মৎস্য খাত: কৃষি ও মৎস্য খাতের কাজ সহজ করতে প্রযুক্তিনির্ভর তিনটি ধারণা নিয়ে কাজ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। তাদের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ফার্মিং রোভার, স্বয়ংক্রিয় জলযান ও ড্রোন। রাজধানীতে আয়োজিত এক উদ্ভাবনী প্রদর্শনীতে তারা এসব ধারণা তুলে ধরে।

শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার সাহায্যে ফসলের রোগাক্রান্ত অংশ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার পরামর্শ দেওয়া হবে। জমি ও ফসলের অবস্থা বিশ্লেষণ করে তথ্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানানো হবে। অন্যদিকে, স্বয়ংক্রিয় জলযান মাছ চাষের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করবে। পানিতে অক্সিজেনসহ বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কৃষি ও মৎস্য খাতের সহায়ক কাজে ড্রোন ব্যবহারের ধারণাও তুলে ধরেছে দলটি। শিক্ষার্থীদের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। এসব ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শ্রম কমানো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই তারা প্রকল্পগুলো তৈরি করেছে। কৃষিতে রোগ শনাক্তকরণ ও স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা কার্যকর হলে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে।

মহাকাশবিজ্ঞান থেকে পরিবেশ সুরক্ষা: মহাকাশবিজ্ঞানে আগ্রহ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে রকেটের মডেল তৈরি করেছে ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজের তিন শিক্ষার্থী। তাদের উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ বাড়ানো, যাতে তারাও ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার স্বপ্ন দেখতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণায় উঠে এসেছে স্মার্ট সিটি, বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগে সহায়ক প্রযুক্তি এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ও।

নেত্রকোনায় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিজ্ঞানমেলায় শিক্ষার্থীরা পরিবেশদূষণ, জ্বালানি সংকট, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা ও কৃষি নিয়ে নানা প্রকল্প প্রদর্শন করেছে। এর মধ্যে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গাছের রোগ শনাক্তকরণ, পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মডেল এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের যোগাযোগে সহায়ক সফটওয়্যার। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলে সহায়তার জন্য সেন্সরযুক্ত চশমার মডেলও তৈরি করেছে শিক্ষার্থীরা। চশমায় থাকা অতিস্বনক সেন্সর সামনে বাধা শনাক্ত করলে শব্দের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করবে। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা, পশুপাখির হাত থেকে ফসল রক্ষা, সৌরবিদ্যুৎ, স্মার্ট উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিকল্প শক্তি নিয়েও কাজ করেছে তারা। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষার সমন্বয়েও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাদরাসার বিজ্ঞানমেলায় শিক্ষার্থীরা রোবটবিদ্যা, সৌরজগৎ, পানি বিশুদ্ধকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিষয় নিয়ে প্রকল্প উপস্থাপন করছে। অল্প বয়স থেকেই এসব বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে পারে।

বিজ্ঞানশিক্ষায় সরকারি পরিকল্পনা: শিশুদের বিজ্ঞানচর্চা বাড়াতে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরির কথা বলছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা এবং সরকারি বিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটবিদ্যা, যন্ত্রশিক্ষণ ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পাঠ্যবইয়ে প্রযুক্তির বিষয় যুক্ত করলেই কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা তৈরি হবে না। শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ, যন্ত্রের কার্যপদ্ধতি বোঝা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রকল্প তৈরির সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পর্যাপ্ত উপকরণ, কার্যকর গবেষণাগার এবং নিয়মিত অর্থায়ন। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। একই জরিপে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশের অন্তত একটি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি দক্ষতা রয়েছে। তবে এ তথ্য স্কুলপড়ুয়া শিশুদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা বিজ্ঞানমেলায় অংশগ্রহণের হার সরাসরি নির্দেশ করে না।

বিজ্ঞানমেলা থেকে গবেষণার পথে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স অ্যান্ড মেকানিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. মো. মেহেদী হাসানের মতে, বিজ্ঞানমেলায় শিক্ষার্থীরা কী তৈরি করছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব কাজে তাদের সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি কতটা বাড়ছে। বিজ্ঞানমেলা, উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করবে। এ জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত আয়োজন এবং সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মনে করেন, শিশু ও তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ এবং প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভাবনী প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা জরুরি। কোন প্রকল্প কতটা কার্যকর, কী ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং আরও উন্নতির সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করে সফল উদ্যোগকে বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে অর্থের অপচয় কমার পাশাপাশি প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ বাড়বে। শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ থাকলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায় রূপ দিতে শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন। নতুন ধারণা পরীক্ষা করা, ভুল থেকে শেখা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকারি পরিকল্পনার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বিজ্ঞানমেলার উদ্যোগ ভবিষ্যতের উদ্ভাবক তৈরির কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ