১৮ অক্টোবর ২০২৬ , ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বাবার কিনে দেওয়া শার্টের ঘ্রাণ আজও খোঁজেন চঞ্চল

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৮-১০-২০২৬
বাবার কিনে দেওয়া শার্টের ঘ্রাণ আজও খোঁজেন চঞ্চল ছবিঃ সংগৃহীত

শরতের সাদা মেঘ, ঢাকের বাদ্য আর নতুন পোশাকের আনন্দ—দুর্গাপূজা এলেই শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। সময়ের সঙ্গে বদলেছে জীবন, কেটেছে অভাবের দিন, এসেছে সচ্ছলতা। এখন পূজায় নিজের সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নতুন পোশাক উপহার দেন তিনি। নিজেও পান নানা উপহার। তবু এত আয়োজনের মধ্যেও মন ভরে না। আজও বাবার কিনে দেওয়া ছিট কাপড়ের শার্টের সেই ঘ্রাণ খুঁজে ফেরেন এই অভিনেতা। কারণ, সেই ঘ্রাণে মিশে আছে বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, শৈশবের অপেক্ষা আর পূজার নির্মল আনন্দ।

ছোট ও বড় পর্দার ব্যস্ত অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর কাছে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার বিশেষ উপলক্ষ। পূজা এলেই তার মন ফিরে যায় গ্রামের বাড়িতে, শৈশবের সেই আনন্দঘন দিনগুলোতে।

ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে একসঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপনের স্মৃতিই তার কাছে পূজার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পূজার আনন্দের কথা বলতে গিয়ে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, “আমার কাছে পূজার আনন্দ একটু ভিন্ন। আমার কাছে পূজা মানেই গ্রামের বাড়িতে ভাই-বোনসহ সবার মিলনমেলা, সবাই মিলে আনন্দ করা। এই পরিবেশ ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে আমি বড় হয়েছি। এই সুন্দর পরিবেশটাই আমি সারা জীবন দেখতে চাই। সব সময় প্রত্যাশা থাকে, পূজার সময়টা সবাইকে নিয়ে কাটানোর। এবারও সেই প্রত্যাশা করছি।”

তবে সময়ের সঙ্গে পূজার আনন্দে যুক্ত হয়েছে বাবাকে হারানোর বেদনা। একসময় বাবার উপস্থিতিতে যে উৎসব পূর্ণতা পেত, এখন সেই মানুষটিকে ছাড়া পূজা এলে স্মৃতিগুলো আরও বেশি করে মনে পড়ে। বাবা ছিলেন তার অভিভাবক, শিক্ষক ও অনুপ্রেরণার উৎস। আনন্দের মুহূর্তগুলোতে বাবার অভাব তাই গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি।

চঞ্চল বলেন, “আগে বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন পূজা বেশি ভালো লাগত। বাবা চলে যাওয়ার পর পূজার সময়ে বাবার কথা বেশি মনে পড়ে। আনন্দের দিনে বাবাকে বেশি মনে পড়ে। বাবা আমার শিক্ষকও ছিলেন। নিশ্চয়ই দূর থেকে তিনি আশীর্বাদ করছেন।”

শৈশবের পূজার স্মৃতিতে ফিরে গেলে চঞ্চলের চোখে ভেসে ওঠে গ্রামের চেনা পরিবেশ। উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হতো পূজার অনেক আগে থেকেই। প্রতিমা তৈরির কাজ থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত পুরো গ্রাম মেতে থাকত আনন্দে। শরতের কাশফুলে সাদা হয়ে থাকা পদ্মার চর আর নতুন পোশাক পাওয়ার অপেক্ষা মিলিয়ে পূজার দিনগুলো ছিল তার কাছে বছরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সময়।

সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এই অভিনেতা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমাদের গ্রামে এই দুর্গাপূজার আমেজ শুরু হতো এক মাস আগে থেকেই। পাল মশাইয়ের প্রতিমা বানানো থেকে শুরু করে দেবী বিসর্জন পর্যন্ত, কী যে এক আনন্দোৎসব! সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতাম কবে আসবে এই উৎসব। শরতের কাশফুলে সাদা হয়ে থাকত পদ্মার চর। সবচেয়ে বড় লোভ, আনন্দ আর উত্তেজনা কাজ করত নতুন পোশাক পাওয়ার আশায়।”

কিন্তু উৎসবের সেই আনন্দের আড়ালে ছিল অভাবের কঠিন বাস্তবতা। সারা বছর নতুন পোশাক কেনার সুযোগ খুব একটা হতো না। সংসারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পূজার সময় সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন বাবা। বাজার থেকে ছিট কাপড় কিনে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন দর্জির কাছে। এরপর শুরু হতো নতুন শার্ট হাতে পাওয়ার অপেক্ষা। দর্জির দোকানে গিয়ে বারবার খোঁজ নেওয়া, কাপড় কাটা হয়েছে কি না, সেলাই কত দূর এগিয়েছে কিংবা বোতাম লাগানো শেষ হয়েছে কি না—এসব ছোট ছোট ঘটনাই ছিল শৈশবের আনন্দের অংশ। চঞ্চল চৌধুরী বলেন, “সারা বছর তেমন নতুন পোশাক আমাদের কপালে জুটত না। কঠিন দারিদ্র‍্যের ভেতরেও পূজার সময় বাবা সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন সবগুলো ভাই-বোনকে নতুন কাপড় কিনে দিতে। সারা বছর একমাত্র এই পূজাতেই আমাদের সৌভাগ্য হতো নতুন পোশাক পরার। ছিট কাপড় কিনে বাবা নিজে সঙ্গে করে শার্টের মাপ দেওয়ার জন্য নিয়ে যেতেন দর্জির কাছে। প্রতিদিন দর্জির কাছে গিয়ে বসে থাকতাম, কাপড় কাটা হলো কি না, সেলাই হলো কতটুকু, বোতাম লাগানো শেষ হলো কি না দেখার জন্য।”



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ