ছবিঃ সংগৃহীত
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন। এ ছাড়া কারাগারে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে এইচআরএসএস। দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং দলটির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলের ৩৪২টি ঘটনায় ২ হাজার ৬৩২ জন আহত এবং ৪০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের ৩২১টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৯০ জন, নিহত ১১ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের ৯৩টি সংঘর্ষে ৫৪৫ জন আহত ও নয়জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির ৪৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন। আওয়ামী লীগ-এনসিপির পাঁচটি ঘটনায় ৫৮ জন এবং আওয়ামী লীগ-জামায়াতের দুটি ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-জামায়াতের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষে ৩২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৭৪টি সহিংসতার ঘটনায় ৪০৫ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ, অর্থাৎ ৯৩১টি ঘটনা ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলটির সঙ্গে অন্যান্য দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে।
নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের আটজন, আওয়ামী লীগের ছয়জন, চরমপন্থী একজন এবং অন্যান্য দল বা রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১২ জন রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থিতা, সমাবেশ, সমর্থকদের সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজিকে এসব সহিংসতার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুর্বৃত্তদের অন্তত ৮৮টি হামলায় কমপক্ষে ১০০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিএনপির ৩০ জন, আওয়ামী লীগের ১১ জন, জামায়াতের পাঁচজন ও অন্যান্য দলের ছয়জনসহ মোট ৫২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫০ জনের বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচন ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে এক হাজারের বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ২ হাজার ৬২৩ জন আহত এবং ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ সময়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন দলের ৫ হাজার ৬৪৪ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭, বিএনপির ৬০৯, জামায়াতের ১৪৫, এনসিপির ৪৩ ও চরমপন্থী ৩৭ জন রয়েছেন। পাশাপাশি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অভিযান, সন্ত্রাস ও নাশকতা দমন এবং পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারের অংশ হিসেবে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে এইচআরএসএস। নয় মাসে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক করা হয়েছে ২০ সাংবাদিককে। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা হয়েছে।
এ সময়ে ৫৮টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে ৪৩৯ জন আহত এবং ৪৬ জন আটক হয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারী রয়েছেন। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ ও সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৪০টি মামলায় ১১৩ জনকে অভিযুক্ত এবং ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন ১২ জন।
রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন চলমান ইস্যু, জুলাই-সংশ্লিষ্ট বিষয়, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানহানিকর কনটেন্ট ও কটূক্তির অভিযোগ ঘিরে চারজন নিহত, চারজন নির্যাতনের শিকার এবং ২১ জন আটক হয়েছেন। এ-সংক্রান্ত ২০টি মামলা হয়েছে এবং ১২ জনকে চাকরিচ্যুত বা সমজাতীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কোরআন অবমাননার অভিযোগে ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে এবং দুজন মারধরের শিকার হয়েছেন। সাইবার বুলিং, ফেসবুকে সমালোচনা ও কটূক্তিসহ অন্যান্য ঘটনায় আরও ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
কারাগারে নয় মাসে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন কয়েদি ও ৫৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২০ জন, বিএনপির একজন এবং সাধারণ বন্দী হিসেবে ৭৪ জনের পরিচয় নথিভুক্ত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১২ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় বহুতল ভবন থেকে পড়ে ও পানিতে ডুবে বিভিন্ন কারণে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে। পুলিশ অটোরিকশা জব্দ করায় মানসিকভাবে অসুস্থ এক অটোরিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময়ে অন্তত একটি গুম ও একটি জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবককে গুমের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর থেকে শামীম খান নামে এক ব্যবসায়ীকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার দুই দিন পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আটক দেখানোর তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নয় মাসে ৫৬টি হামলায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জমি দখলের চারটি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একজন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে বস্তাবন্দি ৪৬টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৮৭টি এবং শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ ৭৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে।