ছবিঃ সংগৃহীত
বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকা। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত প্রায় এক কোটি চারা বিক্রি করে আয় হচ্ছে ১০ কোটি টাকা। এ কৃষিকাজ ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারো মানুষ। পুরুষের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন নারীরাও। তবে পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এ চাষপদ্ধতি সময়ের সঙ্গে কিছুটা আধুনিক হলেও এর সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। নিজেদের শ্রম ও দক্ষতায় কৃষকরা জলাবদ্ধ এলাকাকে উৎপাদনমুখী করে তুলেছেন। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন ঘিরে বদলে যাচ্ছে বহু পরিবারের জীবনযাত্রা। নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে স্থানীয় অসহায় ও কর্মহীন নারীদেরও এ কাজে যুক্ত করেন। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।
ভাসমান বেডে কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদায় বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনছেন, আবার কেউ অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখছেন। পানির ওপর তৈরি এসব বেডেই বেড়ে উঠছে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিমসহ নানা সবজির চারা। নুরজাহানের স্বপ্ন, নিজের উদ্যোগ আরও বড় করার পাশাপাশি কর্মহীন নারীদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে এগোতে পারছেন না তিনি।
নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করে আসছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম। নারীদের কাজ দিতে পারতাম, তারা ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারত। আমি ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।’ এ কাজে যুক্ত নারী শ্রমিকেরা প্রতিদিন কয়েকশ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত চারার প্রাথমিক কাজ করেন। প্রতি এক হাজার দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদার জন্য তাঁরা মজুরি পান ১৫০ টাকা। দিনভর পরিশ্রম করেও তাঁদের আয় সীমিত থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!’
স্থানীয় নারীদের মতে, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হলে তাঁদের অনেকেই নিজস্ব উদ্যোগে চারা উৎপাদন শুরু করতে পারবেন। এতে তাঁদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি ব্লকে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। বিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব চারা পিরোজপুরের পাশাপাশি খুলনা, যশোর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, সকাল ছয়টা থেকে তাঁরা কাজে নেমে পড়েন। বেডে চারা রোপণ, ওষুধ প্রয়োগ ও লতা পরিষ্কারসহ নানা কাজ করতে হয়। এখানকার চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। বিভিন্ন জাতের সবজির চারা প্রতিটি তিন থেকে সাত টাকা দরে বিক্রি হয়। পিরোজপুর পৌর শহরে এসব চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে চারা কিনে এনে বিক্রি করেন। প্রতিটি চারা পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে কিনে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদের ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। কৃষি অফিস থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।