২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

পর্যটন আছে, পর্যটকের নিরাপত্তা কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২০-১০-২০২৬
পর্যটন আছে, পর্যটকের নিরাপত্তা কোথায়? ছবিঃ সংগৃহীত

পর্যটকেরা যেন কেবল টাকা আয়ের উৎস, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা বিবেচ্য বিষয় নয়। অনুমোদনহীন একটি তিনতলা কাঠের স্থাপনা কীভাবে মেরিন ড্রাইভের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এলাকায় গড়ে উঠল এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের পাটুয়ারটেক এলাকাটি বরাবরই পর্যটকদের কাছে এক শান্ত ও মায়াবী স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। মেরিন ড্রাইভের এক পাশে সাগরের নীল জলরাশি আর অন্য পাশে পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু গত শনিবার ভোরের আলো ফুটতেই সেই স্বর্গরাজ্য ঢেকে গেল আগুন আর মৃত্যুর বিভীষিকায়। ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামের একটি কাঠের রিসোর্টে লাগা ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ১০টি তাজা প্রাণ। ছুটির সকালে যে পর্যটকদের ঘুম ভাঙার কথা ছিল সমুদ্রের গর্জনে, ইনানীর সৈকতে তাঁদের দেখতে হলো কাঠকয়লা হয়ে যাওয়া ঝলসানো লাশের সারি। ঘুমন্ত মানুষের এভাবে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা কেবল কক্সবাজারকেই স্তব্ধ করেনি, দেশের পর্যটন খাতের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা মো. তানভির। তিনি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, আগুনে হতাহতের ঘটনায় রাতে উখিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে।

ইনানীর এ অগ্নিকাণ্ড দেশের পর্যটন খাতের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশ কিছু দুর্বলতা সামনে এনেছে। পর্যটকেরা যেন কেবল টাকা আয়ের উৎস, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা বিবেচ্য বিষয় নয়। ফায়ার সার্ভিস ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক পাশে ইটের দেয়াল থাকলেও মূলত কাঠ, বাঁশ আর টিন দিয়ে তৈরি ‘নান্দনিক’ এই রিসোর্টটি কোনো ধরনের ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলছিল। গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল এই রিসোর্টটিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশও দিয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সতর্কবার্তাটিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। আগুন লাগার পর ঘুমন্ত পর্যটকদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক ও কর্মচারীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।

পুরো রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর একের পর এক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের সময়োচিত সতর্কতা ও উদ্ধার তৎপরতা থাকলে হতাহতের মাত্রা হয়তো কমানো সম্ভব হতো। এটি প্রমাণ করে, দেশের পর্যটন খাতে অতিথিদের দেখভালের জন্য কোনো পেশাদার ও দায়িত্বশীল জনবল তৈরি করা হয়নি। কক্সবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কথা সামনে রেখে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে কাঠ, বাঁশ, খড় ও টিনের তৈরি অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার খোঁজে পর্যটকদেরও এসব রিসোর্টের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু ইনানীর এ অগ্নিকাণ্ড মনে করিয়ে দিয়েছে, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও প্রচারের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অনুমোদনহীন একটি তিনতলা কাঠের স্থাপনা কীভাবে মেরিন ড্রাইভের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠল এবং বছরের পর বছর ধরে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিয়েই কি তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছে? কিংবা সেই নোটিশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর জানাও জরুরি।

প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর একটি চেনা চিত্রনাট্য দেখতে হয়। কয়েক সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ আসে—ব্যস, এটুকুই। কিন্তু মূল সমস্যা অধরাই থেকে যায়। যদি আমরা সত্যিই দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এর মালিক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ও অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর অভিযান চালানো দরকার।

ইনানীর সৈকতে ঘুমন্ত পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের পর্যটন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং তদারককারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মুনাফার পাশাপাশি পর্যটকদের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে অবকাঠামো, সৌন্দর্য কিংবা প্রচার—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে পারবে না। পর্যটনের বিকাশের প্রয়োজনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। আমরা আগামীতে আর কোনো ‘টুপটুপ’ কাণ্ড দেখতে চাই না। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ