ছবিঃ সংগৃহীত
কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশের অধিকাংশ ভোটার। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। এতে প্রদেশটির স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনকারীরা বড় ধাক্কা খেলেও তাঁদের তৎপরতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ও কানাডার ভূখণ্ড নিয়ে তাঁর আগের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে এই ফলাফল দেশটির জাতীয় ঐক্যের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ভোট গণনার একপর্যায়ে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে প্রায় ২৩ শতাংশ ভোট পড়ে। তবে এটি সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট ছিল না। ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে স্বাধীনতা নিয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই ভোটকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে গণভোট আয়োজনের সময় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে এমন উদ্যোগ দেশের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে গণভোটের ফল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষে না গেলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁদের নেতারা। স্বাধীন আলবার্টার দাবিতে সক্রিয় সংগঠনগুলোর নেতারা মনে করেন, প্রদেশটির স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে তাঁদের আন্দোলনের প্রয়োজন এখনো শেষ হয়নি।
অন্যদিকে, কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ফলাফল ঘিরে স্বস্তি দেখা গেছে। এডমন্টনে ঐক্যপন্থীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ‘ফরেভার কানাডিয়ান’ প্রচারাভিযানের প্রধান থমাস লুকাসজুক সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের দেশপ্রেম ও ঐক্যের পক্ষে অবস্থানকে স্বাগত জানান। আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথও স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশটিতে চলা বিভক্তি ও অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্যই ভোটের আয়োজন প্রয়োজন ছিল।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে আলবার্টায়। প্রদেশটির অর্থনীতি মূলত জ্বালানি খাতনির্ভর হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশনীতি, তেল উত্তোলন এবং রপ্তানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর জলবায়ুবান্ধব নীতি আলবার্টার তেলশিল্পের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এসব ক্ষোভ থেকেই স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়েছে।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রদেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইলন মাস্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলবার্টার কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে মন্তব্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের যোগাযোগ এবং রিপাবলিকান রাজনৈতিক কর্মীদের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মার্ক কার্নি কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদেশে বিটুমিনসহ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য নতুন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি। জ্বালানি খাতের স্বার্থ রক্ষা এবং প্রদেশটির অর্থনৈতিক উদ্বেগ কমানোর প্রচেষ্টাকে দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটারদের মধ্যেও বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে ভিন্নমত রয়েছে। কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়া ৪৪ বছর বয়সী হেইলি এরডেগার্ড মনে করেন, আলবার্টার তেলসম্পদের আয় অন্য প্রদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করা নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রচারিত নেতিবাচক ধারণা যথাযথ নয়। তাঁর মতে, হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই জরুরি।
প্রাথমিক ফলাফলে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখা গেলেও আলবার্টার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ফলে গণভোটে বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ প্রত্যাখ্যাত হলেও প্রদেশটির স্বায়ত্তশাসন, জ্বালানি নীতি ও রাজস্ব বণ্টন নিয়ে বিতর্ক ভবিষ্যতেও চলতে পারে।