২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

খাবারের অভাবে অপুষ্টির ঝুঁকিতে গাজার শিশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬
খাবারের অভাবে অপুষ্টির ঝুঁকিতে গাজার শিশুরা ছবিঃ সংগৃহীত

গাজায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তীব্র হওয়ায় শিশুদের পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। পণ্যের সরবরাহে বাধা, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক শিশুর খাবারের তালিকা সীমিত হয়ে পড়েছে চা, রুটি আর অল্প কিছু সাধারণ খাবারে। এতে শিশুদের অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতা বাড়ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবক ও চিকিৎসকেরা।

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে একটি তাঁবুতে পাঁচ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লায়লা। তাঁর মেয়েদের বয়স ১৮ মাস থেকে ১০ বছরের মধ্যে। স্বামী যুদ্ধে আহত হওয়ার পর কাজ করতে পারেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন হুদা। সেই আয় দিয়ে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

হুদা জানান, চলতি মাসের শুরুতে গাজায় পণ্য প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। বাজারে ডিম ও দুধ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেসব পণ্য পাওয়া যায়, সেগুলোর দামও অনেক বেশি। ফলে মেয়েদের জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সংকটের প্রভাব টের পেয়েছি। ডিম বা দুধ কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর বেশি করে খাবার কিনে মজুত করার মতো টাকাও আমাদের নেই।’

কোনো কোনো দিন পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসলার মিশ্রণ দুক্কা কিংবা জাআতার দিয়ে ক্যানজাত শিম খান। খাবারের জোগান কমে গেলে চায়ে রুটি ডুবিয়ে খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাঁদের। ডিমের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা কেনা হুদার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। সম্প্রতি এক দোকানি তাঁকে এক ট্রে ডিমের দাম ৬০ ইসরায়েলি শেকেল বা ১৯ ডলার ৪০ সেন্ট বলেছেন।

তাজা শাকসবজি কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণত সপ্তাহে একবার বাজারে গেলেও এখন অল্প পরিমাণে সবজি কিনতে পারছেন হুদা। তাঁর ভাষ্য, প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম প্রায় ১০ শেকেল বা ৩ ডলার ২৫ সেন্ট। টমেটোর দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ শেকেল, যা প্রায় ৩ ডলার ২৫ সেন্ট থেকে ৪ ডলার ৮৫ সেন্টের সমান। কিছু দোকানদার মজুত থাকা সত্ত্বেও পণ্য বিক্রি করছেন না বলেও তাঁর মনে হয়েছে।

খাদ্যসংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে হুদার মেয়েদের স্বাস্থ্যে পড়তে শুরু করেছে। তারা পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। প্রায়ই মাথা ঘোরা ও ক্লান্তিতে ভুগছে। বড় মেয়ে সালমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে গাজা সিটির আল-রানতিসি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসকেরা তার খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির উন্নতি করার পরামর্শ দিয়েছেন।

হুদা বলেন, ‘গত তিন বছরে আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিতে না পারলে আমার মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়বে—এ আশঙ্কা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’

গত ১৪ অক্টোবর গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। এতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়। ব্যবসায়ীদের প্রতি ট্রাকে ১০ হাজার ইসরায়েলি শেকেল বা ৩ হাজার ২২৫ ডলার পরিশোধের দাবি ঘিরে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে ১৯ অক্টোবর ইসরাইল জানায়, গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ধীরে ধীরে আবার চালু করা হবে।

গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের বিষয়টি সমন্বয়কারী ইসরায়েলি সংস্থা কো-অর্ডিনেশন অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ জানায়, ব্যবসায়ীরা তাদের জানিয়েছেন, হামাস ওই অর্থ পরিশোধের দাবি প্রত্যাহার করেছে। তবে হামাসের বক্তব্য, যুদ্ধের শিকার মানুষের সহায়তায় গঠিত তহবিলে এটি ছিল স্বেচ্ছা অনুদান।

বাণিজ্যিক পণ্যের সরবরাহে বাধার পাশাপাশি মানবিক সহায়তাও কমে আসছে। অর্থায়নের সংকটের কারণে গাজায় খাদ্য সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটি গত ১৯ অক্টোবর জানায়, সেপ্টেম্বরে গাজায় ১৬ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও অক্টোবরে তা কমিয়ে ১১ লাখে নামানো হয়েছে।

একই সঙ্গে পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তার পরিমাণও অর্ধেক করা হয়েছে। আগে দুটি খাদ্য প্যাকেট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে একটি, সঙ্গে গমের আটার ছোট একটি বস্তা। প্রতিদিন গরম খাবার সরবরাহের পরিমাণও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হয়েছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ