২৫ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬
আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও কমছে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন। ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহের চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খননের জন্য ৫৯২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস এবং ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। পেট্রোবাংলার অধীন প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ দুটি খনন, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন নির্মাণ এবং উত্তোলিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ তিন বছরের মধ্যে খননকাজ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কূপ দুটি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি দৈনিক ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যাবে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র ইলিশা-১ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পর্যালোচনার পর ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পে সরকারি ঋণ হিসেবে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রস্তাবিত অর্থায়নের প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং বাকি ৩০ শতাংশ সংস্থার নিজস্ব অর্থ থেকে আসবে।

প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু নতুন দুটি কূপ খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে গ্যাসের চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান বাড়তে থাকায় দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানো এখন জ্বালানি খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। নতুন কূপ দুটি থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। তবে এই উৎপাদন দেশের সামগ্রিক গ্যাসের ঘাটতি কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে কূপ দুটির প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি এবং দেশের মোট চাহিদার ওপর।

প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পেছনে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, পরামর্শক নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কয়েকটি খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, গত ১৮ জুন অনুষ্ঠিত পিইসির সভায় ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ৬ সেপ্টেম্বর বিজিএফসিএল সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়। সংশোধিত প্রস্তাবে বিস্তারিত নকশা, ব্যয়ের বিভাজন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশোধিত প্রস্তাবটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।

প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনায় আপৎকালীন বরাদ্দ কমানো হয়েছে। ভৌত আপৎকালীন ব্যয় থেকে পাঁচ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মূল্যজনিত আপৎকালীন ব্যয় থেকে ২২ কোটি ১১ লাখ টাকা কমানো হয়েছে। এ ছাড়া পরামর্শক নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া, বীমা, টেলিফোন, ভ্রমণ ও গুদাম মেরামতের মতো খাতেও ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে তিন শ্রেণির বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও পর্যালোচনায় দুটি বিদেশি ও একটি দেশি পরামর্শক নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। দুটি যানবাহন ভাড়ার পরিবর্তে একটি যানবাহনের সংস্থান রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম, নিরাপত্তাচৌকি ও আনসার ক্যাম্প নির্মাণের মতো কয়েকটি কাজ প্রকল্পের ব্যয় থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু স্থাপনা পরে বিজিএফসিএলের নিজস্ব উন্নয়ন বাজেট থেকে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য পরিবর্তনের কারণে কিছু খাতে ব্যয় বেড়েছে। ডলারপ্রতি টাকার বিনিময়মূল্য ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার পরিবর্তে ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা ধরে হিসাব করায় খনন সরঞ্জাম ভাড়ার ব্যয় তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ কিছু খাতে ব্যয় কমলেও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যজনিত বাড়তি ব্যয় প্রকল্পের হিসাবে যুক্ত হয়েছে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ