৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ভুচিচকে হটিয়ে সংস্কারের রূপরেখা দিল ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬
ভুচিচকে হটিয়ে সংস্কারের রূপরেখা দিল ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ছবিঃ সংগৃহীত

নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দর ভুচিচের দলকে হারিয়ে ক্ষমতার পথে থাকা শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন জোট এবার পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগসহ সার্বিয়ার প্রশাসনের নানা স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদ ছাড়তে বলেছে। দুর্নীতির তদন্ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও করেছে নবনির্বাচিত এ রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

বিবিসি জানায়, স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বেলগ্রেডে পার্লামেন্টের উল্টো পাশে পায়োনিয়ার্স পার্কে এক সমাবেশ থেকে নবনির্বাচিত এমপিরা এ দাবি জানান। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত চান তাঁরা; আলাদা করে উল্লেখ করেন পুলিশপ্রধান, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা বিএআইয়ের প্রধান ও সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের প্রধানের কথা।

বিজয়ী ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর ১৪১ জন এমপির মাধ্যমে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ চলছে। তালিকায় রয়েছেন বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ, আর অন্তত ১২ জন চিকিৎসক ও সার্জন। ক্ষমতা হস্তান্তর শেষ হতে অবশ্য কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। এ সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মুছে ফেলা হতে পারে—এমন শঙ্কা শিক্ষার্থী আন্দোলনের।

ভুচিচ হার মেনে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা না যেতেই বেলগ্রেডের পায়োনিয়ার্স পার্ক থেকে তাঁর সমর্থকদের তাঁবু-শিবির গুটিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে পার্কটি ছিল ভুচিচের অনুগত সমর্থকদের ঘাঁটি। গত সোমবার সকালে সেটি পরিষ্কারে হাত দেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

তাঁদের একজন, ২৫ বছর বয়সী মারিয়া মিলোভানোভিচ বলেন, ‘এটি বসন্তকালীন পরিচ্ছন্নতার প্রথম ধাপ মাত্র। এবার নতুনরা আসছে। আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত, তবে এই কাজের জন্য প্রস্তুতও আছি।’

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দানা বাঁধে ২০২৪ সালের নভেম্বরে, সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে ১৬ জনের প্রাণহানির পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ থেকে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার এবং ঘটনার পেছনে থাকা ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত ছিল তাঁদের দাবি।

আন্দোলনকারীদের ঘোষিত ‘স্টুডেন্ট প্ল্যান’-এ দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট বন্ধ, আত্মসাৎ হওয়া সম্পদ রাষ্ট্রীয় বাজেটে ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সরাসরি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আছে। ভুচিচের অনুগত কর্মকর্তাদের সরানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএসে, যার পরিচালক মানিয়া গ্রিচিচ পদত্যাগ করেছেন।

নবনির্বাচিত এমপি মিরজানা নিকোলিচের মতে, সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়ার অধিকার সার্বিয়ার মানুষের আছে; অথচ বহু বছর আরটিএস সরকারের স্বার্থে কাজ করেছে। নতুন এমপিরা টেলিকম সার্বিয়ার প্রধান ভ্লাদিমির লুচিচকেও সরানোর উদ্যোগ নিতে চান।

ভুচিচের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আনা ব্রনাবিচ অবশ্য উদ্যোগটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আইনের শাসনের বদলে ‘বিপ্লবী বিচার’ চালু করতে চাইছে বিরোধীরা, আর অপছন্দের গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনাও তাদের আছে।

নতুন সরকারের পরিচিত মুখ এমপি দেজান শোশকিচ চান সংস্কার শুরু হোক দ্রুত। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থাকা এই অর্থনীতিবিদ জানান, প্রথম ছয় মাসের মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, আইন মেনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চালানো ও লাস্ট্রেশন আইন করাই তাঁর লক্ষ্য।

লাস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, ভুচিচের সরকার বা দলীয় কাঠামোর যেসব সদস্য সার্বিয়ার নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রমাণ হবে, তাঁরা সরকারি পদে থাকতে পারবেন না।

বেলগ্রেডভিত্তিক ইউরোপীয় পলিসি সেন্টারের গবেষক স্ট্রাহিনিয়া সুবোটিচ অবশ্য মনে করেন, প্রশাসন ও রাজনীতিতে ভুচিচ ও তাঁর দলের দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণের কারণে এমন পরিবর্তনে সময় লাগবে। অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠান ও অংশ ভালোভাবে কাজ করেছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই নতুন প্রশাসনকে এগোতে হবে বলে তাঁর মত।

বিজয়ী ১৪১ প্রার্থীকে সার্বিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়েছিলেন দীর্ঘ ও গোপনীয় একটি প্রক্রিয়ায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনে শিক্ষার্থীদের তৈরি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভার এখন তাঁদের হাতে।

ভিন্ন ভিন্ন মত ও পটভূমির শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচিতে একমত করাতে কয়েক মাস লেগেছে। এখন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নবনির্বাচিত এমপিদের; ক্ষমতা পরিচালনায় শিক্ষার্থীরা সরাসরি থাকবেন না।

বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়নের অধ্যাপক এবং স্টুডেন্ট লিস্টের সদস্য রাদোমির সাইচিচ বিবিসিকে জানান, বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঠিক হবে কাজের ভেতর দিয়েই, তবে নতুন এমপিরা অনুসরণ করবেন শিক্ষার্থীদের তৈরি ১ হাজার ২০০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত পরিকল্পনা। তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নেবে পার্লামেন্ট। তবে যেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তাই আমরা তাঁদের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেব এবং তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করব।’

নতুন এমপিরা রাজনীতিতে আনকোরা, তাঁদের কোনো সুস্পষ্ট নেতাও নেই। দেশের ভেতরের সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বিয়ার জটিল কূটনৈতিক অবস্থান সামলানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, নতুন সরকার প্রথমে অভ্যন্তরীণ সংস্কারেই মন দেবে। কিন্তু পরের নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে হাতে সময় অল্প; আগামী ডিসেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।

আইনের কারণে আলেক্সান্দর ভুচিচ তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে পারবেন না। তবে তাঁর পরাজিত দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি আবার রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘তারা যতটা কল্পনাও করতে পারবে না, তার চেয়ে অনেক দ্রুত আমরা তাদের পরাজিত করব।’



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ