৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬
এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ ছবিঃ সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতির জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে। একই সুবিধা পেয়েছে নেপালও।

উত্তরণের আগে গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি শেষ করার জন্য বাংলাদেশ ও নেপাল সরকার বাড়তি সময় চেয়েছিল।

আজ নিউইয়র্কে বসা সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে লম্বা আলোচনা শেষে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটিকে (ইউএনসিডিপি) চিঠি পাঠিয়ে উত্তরণের সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিল।

বাংলাদেশের সামনে থাকা গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলোকে সিদ্ধান্তে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলছে, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং তার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি বিঘ্নে অনিশ্চিত মাত্রার ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক অভিঘাতগুলোর দীর্ঘ রেশ এবং দেশের ভেতরের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বিবেচনা করে বাংলাদেশকে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ আরও উল্লেখ করেছে, ইউএনসিডিপির মূল্যায়নে বিদ্যমান এলডিসি উত্তরণ কাঠামোয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে ধরা হয় না। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার দাবি রাখে।

সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দেশের ভেতরের নানা বিষয় বাইরের অভিঘাতের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং তা সামাল দিতে সরকারের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।

প্রস্তাবে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বাড়তি এই সময়ে দেশের ভেতরের সংস্কারের কাজ থেমে থাকবে না, বরং তা আরও সামনে এগোতে হবে। জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নানা সংস্থার সহায়তা নিতে এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে বলা হয়েছে। কৌশলটি কতদূর এগোল, প্রতিবছর ইউএনসিডিপিকে দেওয়া প্রতিবেদনে তা নিয়মিত তুলে ধরতে হবে বাংলাদেশকে।

বাংলাদেশের চিঠি পাওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউএনসিডিপির ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে অনুরোধটি যাচাইয়ে একটি প্যানেল গঠন করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার জন্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠায়।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

আবেদনটি সমর্থন পেয়েছে জি-৭৭ভুক্ত দেশগুলোর। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) বাংলাদেশের অনুরোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

তিন বছর সময় বাড়ায় বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক বসার আশঙ্কা থেকে আপাতত রেহাই পাওয়া যাবে। উত্তরণের প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে শেষ করা ও প্রক্রিয়াটি মসৃণ রাখতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অনেক দিন ধরেই সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

এলডিসি হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটে শুল্কমুক্ত বাজারে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশই এলডিসিভিত্তিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায়।

তিনটি শর্ত—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)—পূরণ হওয়ায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এ বছরই তালিকা ছাড়ত বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের পরের দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাতেই ইউএনসিডিপি দেখেছে, তিনটি শর্তই পূরণ করেছে দেশটি। এর আগেও একবার, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে, প্রস্তুতির জন্য দুই বছর বাড়তি সময় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসিভুক্ত দেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) উত্তরণসীমা ছিল ১ হাজার ৩০৭ ডলার। তখন বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল ২ হাজার ৬৮৪ ডলার।

ওই পর্যালোচনাতেই মানবসম্পদ সূচকের (এইচএআই) ন্যূনতম মান ধরা হয়েছিল ৫৯ দশমিক ৬, যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫।

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের (ইভিআই) সীমা ছিল ৪০ দশমিক ৬, আর বাংলাদেশের স্কোর ২১ দশমিক ৯।

সব মানদণ্ড পূরণ করা গেলেও উত্তরণের পরের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং অর্জিত উন্নয়ন ধরে রাখাই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলডিসি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরণ তুলনামূলক জটিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রক্রিয়া এগোতে হচ্ছে, যা কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতিকে চাপের মুখে ফেলেছে।

২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়া হয়। তার আগে ২০১৮ সালের মার্চে দেশটি প্রথমবারের মতো তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছিল।

জাতিসংঘের নিয়মে উত্তরণের যোগ্যতা পেতে কোনো দেশকে অন্তত দুটি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। এ পর্যন্ত তিনটিই পূরণ করেছে শুধু বাংলাদেশ। তবে যোগ্যতা পাওয়ার পরও পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় সেই অবস্থান ধরে রাখতে হয়।

২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, যা জাতিসংঘ-নির্ধারিত ১ হাজার ২২২ ডলারের সীমার ওপরে। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৫ দশমিক ৩, সীমা ছিল ৬৬। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে স্কোর ছিল ২৭ দশমিক ৩, যা উত্তরণের জন্য ঠিক করা ৩২-এর সীমার নিচে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ