ছবিঃ সংগৃহীত
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ১২৪ জন স্বামী, বাবা ও ভাইয়ের নাম লেখা আছে হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার একটি তালিকায়। গির্জার বাইরে বসে সেই তালিকা থেকে একটি একটি করে নাম পড়ে শোনান সারধাদেবী থাদচানামূর্তি।
শ্রীলঙ্কার বাট্টিকালোয়া থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ষাটের কোঠার এই তামিল নারী এরপর হাতে তুলে নেন একটি প্ল্যাকার্ড। আরও তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যস্ত শহর বাট্টিকালোয়ার সড়কে শুরু হয় তাঁদের ‘ন্যায়বিচারের দাবিতে পদযাত্রা’। নিখোঁজ স্বজনদের কী হয়েছে, তা জানতে চলা এই ধারাবাহিক প্রতিবাদ রোববার পৌঁছায় টানা ১ হাজার ৬০৪তম দিনে।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধ চলেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি বাহিনী আর তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের মধ্যে। তামিলরা দেশটির সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, যাদের বেশির ভাগই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
জাতিসংঘের হিসাবে, ওই যুদ্ধে প্রাণ হারান এক লাখের বেশি মানুষ, তাঁদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক। এর বাইরে নিরাপত্তা বাহিনী অথবা তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) হাতে নিখোঁজ, অপহরণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হন কয়েক দশ হাজার মানুষ।
যুদ্ধ থেমেছে ১৫ বছরেরও বেশি সময় আগে, অথচ নিখোঁজদের বেশির ভাগের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা আজও অজানা। অভিযোগ, আদালতে আবেদন, প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক চাপ কিংবা সরকারের বারবারের প্রতিশ্রুতি—কোনো কিছুই এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেনি।
যুদ্ধের ভয়াবহতা আর নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে উত্তরের খোঁজে পরিবারগুলোর দীর্ঘ লড়াই—দুটিরই প্রতিচ্ছবি থাদচানামূর্তির জীবন।
১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তাঁদের কৃষিজমিতে পাওয়া যায় তাঁর ৩৪ বছর বয়সী স্বামী নাল্লাথাম্বির গুলিবিদ্ধ মরদেহ; মাথায় গুলি করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, তাঁকে হত্যা করেছেন একজন সেনাসদস্য। স্বামী হত্যার অভিযোগ নিয়ে তখনই পুলিশের কাছে যান স্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল, “আপনি যদি বলেন আপনার স্বামীকে একজন সেনাসদস্য হত্যা করেছে, তাহলে তারা আর কখনো তাঁকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেবে না।”’
শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। স্বামীর মরদেহ উদ্ধারের পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পান ৫০ হাজার রুপি, বর্তমান বিনিময় হারে যা ১৫১ ডলার। এরপর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান থাদচানামূর্তি।
২০০০ সালের জানুয়ারিতে নিখোঁজ হন তাঁর ১৯ বছর বয়সী ছেলে নাভানীথান। থাদচানামূর্তির বিশ্বাস, দলে যোগ দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তামিল বিদ্রোহীরা তাঁকে অপহরণ করেছিল।
‘তাঁকে আমি আর কখনো দেখিনি। ২০১৬ সালে আমি কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। জবাবে তারা জানায়, তার পরিণতি অজানা। আমাকে শুধু নিখোঁজ হওয়ার একটি সনদ দেওয়া হয়েছিল, সত্যটা নয়,’ বলেন তিনি।
লক্ষ্মী সিলভার গল্পও প্রায় একই রকম। ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে বাসে চড়ে কলম্বো যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন তাঁর স্বামী। একটি চেকপোস্টে সশস্ত্র লোকেরা তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।
লক্ষ্মী বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে বলেছিলেন, তারা “টাইগার” ছিল।’ শব্দটি দিয়ে তিনি তামিল বিদ্রোহীদের বোঝান।
পুলিশ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী—কারও কাছে করা আবেদনেরই জবাব মেলেনি। যাঁদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ বরং ঝামেলা না বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
১৯৯৪ সালে এক ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর স্বামীর মৃত্যু সনদ দেন, যেখানে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল ‘অজ্ঞাত’। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ষাটের কোঠার লক্ষ্মী সিলভা স্বীকার করেন, ‘আমি এখন আর মনে করি না যে তিনি ফিরে আসবেন।’ তাঁর কথায়, ‘এখন আমি শুধু সন্তানদের জন্য বেঁচে আছি।’
তবে নীরবতা মেনে নিতে অন্যরা এখনো রাজি নন। ৬১ বছর বয়সী রাজেশ্বরী চিত্রাভাদিভেল বলেন, ‘আমি সব সময় আশা ধরে রেখেছি।’
তাঁর দেয়ালে ঝুলছে কয়লায় আঁকা একটি প্রতিকৃতি—গোঁফওয়ালা হাস্যোজ্জ্বল এক পুরুষ, দাঁড়িয়ে আছেন স্ত্রী ও মেয়ের মাঝখানে। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেনাকাটা করতে বেরিয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিদের হাতে অপহৃত হন রাজেশ্বরীর স্বামী, সেই থেকে তিনি নিখোঁজ।
১৯৯৮ সালে কর্তৃপক্ষ রাজেশ্বরীকে একটি মৃত্যু সনদ দেয়। এর দুই বছর পর শনাক্ত করার জন্য এক ব্যক্তির মরদেহ তাঁর কাছে দেয় রেড ক্রস; সংস্থাটি জানায়, সেটি তাঁর স্বামীর হতে পারে।
রাজেশ্বরী বলেন, ‘মরদেহটি চেনার উপায় ছিল না। তাই আমি এখনো বিশ্বাস করি।’
এমন ঘটনার বিচার আর সত্য উদ্ঘাটনের দাবিতেই প্রতিদিনের এই প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। আর্জেন্টিনার ‘মাদার্স অব দ্য প্লাজা দে মায়ো’ আন্দোলনের সঙ্গে এর মিল আছে—১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সে দেশের সামরিক স্বৈরশাসনের সময় নিখোঁজ সন্তানদের পরিণতি জানতে সেখানকার নারীরাও বছরের পর বছর বিক্ষোভ করেছিলেন।
নিয়মিত পদযাত্রায় অংশ নেওয়া আন্দোলনকর্মী সারালা ইমানুয়েল বলেন, ‘আমরা গোপনে আশা করেছিলাম, হাজার হাজার মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’ তাঁর আক্ষেপ, ‘কিন্তু কিছুই বদলায়নি, এখনো এক গভীর নীরবতা বিরাজ করছে।’
২০০৯ সালে যুদ্ধের অবসানের পর থেকেই শ্রীলঙ্কার নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধকালীন অপরাধের তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
২০২৪ সালে অনুরা কুমারা দিসানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে নতুন করে আশা জাগে। দেশটির প্রথম বামপন্থী এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ হওয়া এবং হামলার’ তদন্ত আর একটি স্বাধীন জাতীয় কৌঁসুলি দপ্তর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
দুই বছর পর, গত সেপ্টেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, কিছু অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, তবে ‘দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর জরুরি প্রয়োজন’ মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
প্রস্তাবিত স্বাধীন কৌঁসুলি দপ্তর নিয়ে এএফপির প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি শ্রীলঙ্কার আইন মন্ত্রণালয়।
তামিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাসামানিক্কাম আর. শানাকিয়ান বলেন, ‘দুয়েকটি আলোচিত মামলায় কিছু তদন্ত হচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই নেই।’
তাঁর মতে, ‘পরপর আসা সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পায়।’ শানাকিয়ান মনে করিয়ে দেন, দেশটির বেশির ভাগ মানুষ সিংহলি বৌদ্ধ, আর শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এ নিয়ে পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক। তিনি বলেন, ‘তারা জানে, এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই ফিরে আসবে।’
নিখোঁজদের পরিণতি নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়ে ২০১৮ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিবিষয়ক দপ্তর (ওএমপি) প্রতিষ্ঠা করে সরকার। দপ্তরটির হিসাবে বর্তমানে তাদের কাছে ২২ হাজার নিখোঁজের মামলা নথিভুক্ত, যদিও জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। গত তিন বছরে মাত্র ২৪ জনের সন্ধান পেয়েছে দপ্তরটি।
দপ্তরের সদস্য মিরাক রহিম স্বীকার করেন, ‘যেসব পরিবার দুই, কখনো কখনো তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য এটা স্পষ্ট যে কাজ যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক নথি হারিয়ে গেছে এবং মানুষ নিজেদের স্মৃতি থেকে ঘটনাগুলো পুনর্গঠন করেছে।’
ক্লান্তি থাকলেও দমে যাননি থাদচানামূর্তি; পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমরা টাকা চাই না, শুধু সত্য ও ন্যায়বিচার চাই। আমাদের দুর্ভোগের ভার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দিতে আমি রাজি নই।’