ছবিঃ সংগৃহীত
আদালতকক্ষে প্রবেশের আগেই বন্দিদের এগিয়ে আসার শব্দ শোনা যায়; তাদের পায়ের গোড়ালিতে থাকা শিকল প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে ঝনঝন করে বেজে ওঠে।
আদালতকক্ষে প্রবেশ করা এই পাঁচজন ব্যক্তি এখানকার নিয়মিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত; তারা একাধিক ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং গত পাঁচ বছরের বড় একটি সময় তাদের আদালতে আসা-যাওয়ার মধ্যেই কেটেছে।
তাদের মধ্যে একজন—চশমা পরা, কিছুটা খর্বাকৃতির ও ধূসর চুলের মানুষ—তার তিন বছর বয়সী ছেলেকে জড়িয়ে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। ছেলেটিকে তার সঙ্গী আদালতে নিয়ে এসেছিলেন বাবার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য।
তিনি হলেন ৪২ বছর বয়সী মানবাধিকার আইনজীবী আরনন নামপা। তার অপরাধ ছিল—থাইল্যান্ডের শক্তিশালী রাজতন্ত্রের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহিতার দাবি জানানো। ২০২০ সালে ব্যাংককের কেন্দ্রে আয়োজিত ‘হ্যারি পটার’ থিমযুক্ত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি হ্যারি পটারের বেশ ধারণ করে এই দাবি তুলেছিলেন।
শুক্রবার ব্যাংককের একটি আদালত তাকে থাইল্যান্ডের ‘লেজ ম্যাজেস্টি’ (রাজপরিবার অবমাননা সংক্রান্ত) আইন—যা ১১২ নম্বর ধারা হিসেবে পরিচিত—লঙ্ঘনের দায়ে দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। এই আইনের আওতায় রাজপরিবারকে অবমাননা করার অভিযোগে যত মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বের অন্য যেসব দেশে একই ধরনের আইন রয়েছে, সেসব দেশের মোট কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যার চেয়েও বেশি।
একই অভিযোগে আরননের বিরুদ্ধে মোট ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে; এর মধ্যে কেবল একটি মামলায় এই রায় দেওয়া হলো। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তার মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বছরেরও বেশি। আরো দুটি মামলার রায় এখনো বাকি।
সাংবাদিকদের কাছে আরনন বলেন, “আমার কাছে এটি কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়। দেশটি যদি আরও উন্মুক্ত হতো, তবে আমরা এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারতাম।”
আরনন নামপার ১০ বছর বয়সী মেয়ের আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, তার বাবা কারাগারের শিকল দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
গত ছয় বছরে থাইল্যান্ডের ইতিহাসে ‘লেজ ম্যাজেস্টি’ আইনের সবচেয়ে ব্যাপক প্রয়োগ দেখা গেছে। ২০২০ সালে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় এই আইন প্রয়োগ করা হয়; সেই আন্দোলনে প্রথমবারের মতো রাজতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার দাবি তোলা হয়েছিল। ১৮ বছরের কম বয়সী ২০ জনসহ মোট ২৯৪ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাদের ৫০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের বিচার এখনো চলছে।
এই আইনের অধীনে অভিযুক্তদের অধিকাংশকেই জামিন দেওয়া হয় না এবং কারাগারে আটকে রাখা হয়। অথচ তাদের বিচার প্রক্রিয়া কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
থাই কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই আইনের সপক্ষে সাধারণত যে যুক্তি দেওয়া হয় তা হলো, এটি “থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে; যেখানে রাজতন্ত্র হলো জাতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং অধিকাংশ থাই নাগরিকের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র।” থাই দণ্ডবিধির ১১২ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “যে কেউ রাজা, রানী, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বা রাজপ্রতিনিধিকে অপবাদ দিলে, অপমান করলে বা হুমকি দিলে, তাকে তিন থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।”
তবে বাস্তবে, এই আইনটিকে অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে ব্যাখ্যা করা হয়, যার আওতায় রাজতন্ত্র সম্পর্কিত নানা ধরনের মন্তব্য এবং অনেক ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েন। রাজপরিবারের কোনো সদস্য, রাজতন্ত্র নামক প্রতিষ্ঠান, এমনকি বহু আগে প্রয়াত কোনো রাজা—এমনকি একটি ক্ষেত্রে রাজার পোষা কুকুর—সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার জন্যও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘থাই লয়ার্স ফর হিউম্যান রাইটস’ নামক সংস্থার সহকারী পরিচালক আকারাচাই চাইমানিকারাকাতে বলেন, “আইনের মূল পাঠে কী লেখা আছে, তা আমি আপনাকে বলতে পারি। কিন্তু আদালত কীভাবে ‘অপবাদ’ বা ‘অপমান’ শব্দগুলোকে ব্যাখ্যা করে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়; কারণ এই শব্দগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক। এমনকি এই আইনটি নিয়ে প্রশ্ন তোলাও ১১২ নম্বর ধারার অধীনে ‘রাজমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।”