০২ নভেম্বর ২০২৬ , ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

সীমান্ত সংকট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম: জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০১-১১-২০২৬
সীমান্ত সংকট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম: জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্ন ছবিঃ সংগৃহীত

স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হলো ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা করা, আর এই রক্ষাকবচ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান কর্তব্য। কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল নৈসর্গিক রূপের কেন্দ্রবিন্দু নয়, এটি একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল এক ফ্রন্টলাইন। ভারত ও মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সীমানাঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও ঘন অরণ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে, যা দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন ভূ-রাজনৈতিক হুমকির জন্ম দিচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রম করে অস্ত্র চোরাচালান, আন্তঃসীমান্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা যখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ খোঁজে, তখন এই ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখা সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্‌ণ রাখা ও সীমান্ত সুরক্ষার তাগিদে পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর কৌশলগত ও স্থায়ী উপস্থিতি জোরদার করা রাষ্ট্রের দূরদর্শী এবং অপরিহার্য পদক্ষেপ।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হলো তার সুসংহত সার্বভৌমত্ব। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র যদি নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী না করে, তবে প্রতিবেশী অঞ্চলে উদ্র্ভূত নিরাপত্তা সংকট দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতি মূলত পাহাড়, ঘন জঙ্গল ও দুর্গম সীমান্ত দ্বারা গঠিত, যা প্রথাগত পাহারার জন্য অত্যন্ত কঠিন। অতীতেও এই দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজস্ব বলয় তৈরির চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের মতো জাতীয় হুমকিগুলো মোকাবিলা করতে রাষ্ট্রকে সদা সতর্ক থাকতে হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি ও কৌশলগত উপস্থিতি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার একটি আইনগত ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষায় সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজনীয় ঘাঁটি স্থাপন এবং স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সীমান্ত নিরাপত্তা সুসংহত করা। বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিস্তীর্ণ দুর্গম অংশে অবাধ চলাচল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ঘাঁটি জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন সীমান্ত সংকটের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্র তাদের স্পর্শকাতর ও সীমান্তবর্তী দুর্গম অঞ্চলে স্থায়ী নিরাপত্তা অবকাঠামো ও টহল জোরদার করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা পরবর্তীতে গুরুতর ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট ঘাটির মাধ্যমে সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের কৌশল বহু বছর ধরেই কার্যকর রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে স্পর্শকাতর ও দুর্গম সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তা ঘাঁটি পরিচালনা করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

শান্তি ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সুসংহত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরকার এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সহিংসতার ইতি টেনে শান্তি ও উন্নয়নের পথ সুগম করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী সেনাক্যাম্প গুটিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া পরিচালিত হলেও, সেটির সুফলের পাশাপাশি কিছু আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনরায় উত্থান ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এক নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। স্থানীয় পাহাড়ী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধান, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং অবৈধ অস্ত্রের মহড়া বন্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের মূল কাজ হলো সব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া। নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিতি কমানোর ফলে শূন্যস্থান তৈরি হলে সেখানে অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়, যা প্রকারান্তরে পুরো দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা সরকারের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিমণ্ডলে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত পেরিয়ে গোলার খোলস পড়া, আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রত্যক্ষ হুমকি। এই সংকটময় মুহূর্তে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা হ্রাস করা হয় বা তাদের ঘাঁটিসমূহ গুটিয়ে নেওয়া হয়, তবে সীমান্ত পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি থেকে যায়। বিশ্বব্যাপী যেকোনো আন্তর্জাতিক সার্বভৌম নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের কোনো অংশকে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে রাখা যায় না। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৌশলগত ঘাঁটিগুলো পূর্ণাঙ্গ সচল রাখা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত।

আমাদের সংবিধানের মূল কথা হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অঞ্চলগত অখণ্ডতা এবং শাসনব্যবস্থা পূর্ণরূপে অক্ষুণ্‌ণ রাখা। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা শুধু বহিরাগত আক্রমণ রোধ করা নয়, বরং রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ধ্বংস করাকেও নির্দেশ করে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কেবল সীমান্ত পাহারা দেয় না, বরং দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণে বলিষ্ঠ অবদান রাখছে। ফলে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ঘাঁটিগুলো সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি সিভিল-সামরিক সমন্বয়ের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই নিরাপত্তা ছত্রছায়া না থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পের দ্রুত বিকাশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।

অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেবল সামরিক ব্যবস্থা বা শক্তি প্রয়োগই একমাত্র সমাধান নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন। নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, যা রাজনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যেখানে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, সেখানেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সরাসরি সাহায্য করবে। তাই প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবস্থানকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে, সামগ্রিক শান্তি ও জাতীয় অগ্রগতির অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

সর্বোপরি দেশের সার্বিক অখণ্ডতা ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান জোরদার করা রাষ্ট্রের দূরদর্শী ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মুখে জাতীয় প্রতিরক্ষাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সময়ের অন্যতম দাবি। রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সুচিন্তিত, কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে পাহাড়ি এই সীমান্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন নিরাপত্তা ঘাঁটি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্‌ণ রেখে পার্বত্য এলাকার সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আন্তরিক প্রয়াস অব্যাহত রাখাই হোক আমাদের জাতীয় দূরদর্শিতার মূল অঙ্গীকার।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ