ছবিঃ সংগৃহীত
মেগাসিটি ঢাকায় পানির অপরিমিত ও অপরিকল্পিত ব্যবহার নগরবাসীকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মাটির নিচ থেকে অবিরাম পাম্পিং ও কৃত্রিম পুনর্ভরন না হওয়ায় ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির তল দিন দিন ভয়াবহ গতিতে নিচে নেমে যাচ্ছে। গত আড়াই দশকে মাটির নিচের এই পানির উৎস প্রায় ৬৭ মিটার গভীরে চলে গেছে। পরিস্থিতির যদি দ্রুত কোনো গুণগত পরিবর্তন না হয়, তবে চলতি বছরের মধ্যেই এই অবক্ষয় ১১৫ মিটার বা তারচেয়েও বেশি গভীরতায় পৌঁছানোর আশঙ্কাজনক তথ্য মিলেছে। ঢাকার ভূগর্ভস্থ এই অমূল্য সম্পদের অভাবনীয় নিঃশেষ নগরের সামগ্রিক ভূ-গঠন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
রাজধানী নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন পড়ে। এই সুবিশাল চাহিদার একটি বড় অংশ—প্রায় ৭০ শতাংশ (যা দৈনিক প্রায় ২০৩ কোটি লিটার)—মেটানো হয় মাটির নিচের গভীর নলকূপের মাধ্যমে। অপরদিকে ঢাকার আশেপাশে ও ভেতরের ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসের চরম বেহাল অবস্থার কারণে নদীর পানি শোধন করে পাওয়া যায় চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ বা ৮৭ কোটি লিটারের মতো। যদিও ঢাকা ওয়াসা দাবি করে থাকে তাদের দৈনিক ৩২০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায় উৎপাদন ও প্রকৃত পৌঁছানোর মধ্যে রয়েছে বিরাট এক ঘাটতি। এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ নগরবাসীকে; বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে মিরপুরসহ রাজধানীর বিস্তৃত জনপদে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট।
নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকার প্রধান সংকট তৈরি হয়েছে এর ভূমি ব্যবহারে। একটি মানসম্মত পরিকল্পিত নগরে অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ ভূমি এবং ১০ থেকে ১২ শতাংশ জলাধার থাকা আবশ্যক। অথচ ঢাকা শহরে সবুজ স্থান ও জলাশয় দুই মিলে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঢাকার বিশাল এলাকা কংক্রিটে ঢেকে ফেলায় বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশের প্রাকৃতিক রাস্তা বা থন্যাচারাল রিচার্জ' পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মাটির নিচ থেকে যে হারে লিটার লিটার পানি উঠানো হচ্ছে, প্রকৃতি সেই হারে পানি আর মাটিতে প্রবেশ করাতে পারছে না। নতুন করে জায়গা খালি করে সবুজায়ন করা এখন অসম্ভব হলেও বিদ্যমান নদী ও জলাশয়গুলো দ্রুত উদ্ধার করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মাটির নিচ থেকে পানি তোলার এই অস্বাভাবিক হারের সরাসরি আর্থিক ও ভৌগোলিক খেসারত দিতে হবে নগরবাসীকে। পানির স্তর ক্রমাগত নামতে থাকায় সামনে আরও গভীর গভীরতর নলকূপ স্থাপন করতে হবে, যা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ ফেলবে এবং পানি উত্তোলনের খরচ বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে।
শুধু তাই নয়, ভূগর্ভস্থ পানির খালি হয়ে যাওয়া স্তর পরিবেশগত এক বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত পানি তোলায় মাটির নিচের শুষ্ক স্তর সংকুচিত হয়ে ভূমির অবনমন বা ধস নামতে পারে। ঢাকা শহর মূলত 'মধুপুর কাদা' নামক অপেক্ষাকৃত শক্ত মাটির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এ মাটির স্তর নগরকে কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারবে তা নিশ্চিত নয়। কৃত্রিমভাবে ভরাট করা নিম্নাঞ্চল এবং অনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবনের বিশাল ভার পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
রাজধানীর সর্বত্র মাটির গঠন একরকম নয়। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, পুরোনো ঢাকার কিছু এলাকায় শক্ত কাদা থাকলেও বসুন্ধরা কিংবা জলসিঁড়ির মতো ভরাট করা নতুন নগর এলাকাগুলো গঠিত নরম মাটিতে। এসব অঞ্চলে পানির স্তরের পতন এবং ভূ-গঠনের পরিবর্তন ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জামাল উদ্দিন ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎসের ওপর গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, যত্রতত্র ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গভীর নলকূপ বসানো কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজউক কর্তৃক যেকোনো স্থাপনার অনুমোদন দেওয়ার সময়েই নিশ্চিত করতে হবে ওই ভবনের পানির মূল উৎস কী হবে। এছাড়াও ঢাকা ওয়াসা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে 'বৃষ্টির পানি ধরে রাখা' বা রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিংকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
যদিও ঢাকা ওয়াসা ২০৩০ সালের মধ্যে মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা বলছে, কিন্তু তাদের সার্বিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত বাস্তবায়নে রয়ে গেছে বিশাল ব্যবধান। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ের পদক্ষেপ জানতে বারবার ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মুহা. মনিরুজ্জামানকে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ, নদী-জলাশয় দূষণমুক্ত করে পুনঃব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নিলে রাজধানী ঢাকা নিকট ভবিষ্যতেই এক বিশাল পানিশূন্যতা ও দুর্যোগময় ভৌগোলিক ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।