ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল দুই প্রভাবশালী নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে ইসরায়েলে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। ফলে দুই নেতার ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ২১৮টি আসন প্রয়োজন হলেও দলটি পেয়েছে ২২৫টি আসন। ভোট গণনা চলা আরও ৩৮টি আসনে তারা এগিয়ে রয়েছে। সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৫১টি আসন ছাড়িয়ে ৫৪টিতে জয় নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। আরও একটি আসনে তারা এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানরা পেয়েছে যথাক্রমে ১৩৬ ও ৪৩টি আসন। চূড়ান্ত ফলাফলে এই সংখ্যা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
এই ফলকে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের সময় নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও শুল্কনীতির প্রভাব তাঁর সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসন বণ্টনের লড়াই না থেকে ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের গণভোটে পরিণত হয়েছে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে না। তাঁর হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নীতি পরিচালনার সুযোগ থাকবে। ফলে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন করে তুলতে পারলেও সব সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারবে না। তবে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন তদন্ত কমিটি গঠন, শুনানি ও তলবের ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে পারবে। এতে বাজেট, ঋণসীমা, শুল্কনীতি ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ফল মেনে নিতে প্রস্তুত এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আপত্তি নেই। অথচ নির্বাচনী প্রচারের সময় ডেমোক্র্যাটদের নীতির বিষয়ে ভোটারদের সতর্ক করেছিলেন তিনি। এখন তাঁর বক্তব্যে তুলনামূলক নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সংকটের ধরন ভিন্ন। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর দল লিকুদ পার্টি নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে এককভাবে ২৭টি পেয়েছে। জোটের শরিকদের আসন যোগ করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৫৩। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। তাদের সঙ্গে ১৯টি আসন পাওয়া আরব দলগুলোর সমর্থন থাকায় সরকার গঠনের দৌড়ে বিরোধীরা এগিয়ে রয়েছে।
বুধবার ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনাময় জোটের একজন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোট সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে দেশটির গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে। তবে সরকার গঠনের জন্য তাঁকে সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পর কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন নেতানিয়াহু। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেছেন, ‘জয় চুরি হয়ে গেছে।’ বিরোধী জোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। ডেমোক্র্যাটরা শুল্কনীতি, বাণিজ্য চুক্তি ও প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকেম জেফরিস জানিয়েছেন, ট্রাম্পের শুল্ক প্রত্যাহার বা এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করা তাঁদের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে এ বিষয়ে উত্থাপিত বিলগুলো নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের করা বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্ক ছাড়ের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়েও তদন্ত করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর কোনো নীতির বিরুদ্ধে আইন পাস হলে তিনি তাতে ভেটো দেবেন। ফলে এ নিয়ে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও ট্রাম্পের সামনে নতুন হিসাব-নিকাশের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করতে পারেন। একই প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক রায়ান হাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাণিজ্যনীতিতে ট্রাম্পের সক্রিয়তা অব্যাহত থাকতে পারে। কানাডার প্রতি তাঁর সাম্প্রতিক বৈরী মনোভাবেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।
তবে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির দাম এবং কংগ্রেসের নজরদারি ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সমঝোতার পথেও ঠেলে দিতে পারে। ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি জানিয়েছেন, পুনরায় আলোচনা শুরুর বিষয়ে তাঁরা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের একটি চিঠি পেয়েছেন। চিঠির বক্তব্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য বিদায় বা দুর্বল সরকার ইসরায়েলের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বিরোধী জোটকে সমর্থন দেওয়া আরব দলগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন শর্ত দিয়েছে। ফলে নতুন সরকার গঠিত হলে গাজা, ইরান, লেবানন ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে শুরুতে সংযত অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সরকার পরিবর্তন হলেই মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে দ্রুত ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হুমকি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবর্তন দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের প্রতি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা নিয়ে ট্রাম্প নিজেও নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ চলাকালে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর একটি সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় ২০২৭ সাল থেকে ইসরায়েলকে বছরে দেওয়া ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা বন্ধ করা হবে। তবে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
জ্বালানি সরবরাহের ওপরও এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। ইরান যুদ্ধ বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার নির্বাচনী ব্যর্থতার সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরাতে ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। ভোটের আগে তিনি ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর বাকি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলে ইরানে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপেও নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে।