০৮ নভেম্বর ২০২৬ , ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

নতুন শতাব্দীর ‘মহামন্দা’র কারণ কি তবে এআই?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০৮-১১-২০২৬
নতুন শতাব্দীর ‘মহামন্দা’র কারণ কি তবে এআই? ছবিঃ সংগৃহীত

বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। একে বলা হয় The Great উবঢ়ৎবংংরড়হ।

১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া এই সংকট দ্রুত ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় পুরো ১৯৩০-এর দশকজুড়ে এর প্রভাব বজায় থাকে। এই সময়ে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারায়, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, মানুষের আয় কমে যায় এবং দারিদ্র‍্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে ভেঙে পড়েছিল যে বহু পরিবারকে খাবার ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও হিমশিম খেতে হয়েছিল।

গ্রেট ডিপ্রেশনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস।

১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। অনেক মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনছিলেন। কিন্তু শেয়ারের দাম কম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। ১৯২৯ সালের অক্টোবরে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে ব্যাপকভাবে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করলে বাজারে ধস নামে।

এতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারিয়ে যায় এবং মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।

তবে শেয়ারবাজারের ধসই ডিপ্রেশনের একমাত্র কারণ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে আগে থেকেই বেশ কিছু দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ছিল, কিন্তু চাহিদা যথেষ্ট ছিল না।

কৃষকরাও অতিরিক্ত উৎপাদন ও কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়ার কারণে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হচ্ছিলেন। অন্যদিকে, সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে সমাজের একটি বড় অংশের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও সংকটকে আরো গভীর করে। শেয়ারবাজারে ধসের পর বহু মানুষ ব্যাংক থেকে নিজেদের আমানত তুলে নিতে শুরু করেন। অনেক ব্যাংকের কাছে সবার টাকা ফেরত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ছিল না। ফলে অসংখ্য ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় এবং মানুষ তাদের সঞ্চয় হারায়। ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অর্থের সংকটে পড়ে, উৎপাদন কমায় এবং কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। এর ফলে বেকারত্ব বাড়ে, মানুষের আয় কমে এবং পণ্য কেনার ক্ষমতা আরো হ্রাস পায়। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সংকট নিজেই নিজের তীব্রতা বাড়াতে থাকে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সংকোচন এবং বিভিন্ন দেশের কঠোর অর্থনৈতিক নীতির কারণে। যুক্তরাষ্ট্র আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ালে অন্যান্য দেশও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমে যায় এবং সংকট এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অনেক দেশের অর্থনীতি ঋণ ও আর্থিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও ছিল, ফলে তারাও এই সংকটের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। আগের দশকেই একটা বিশ্বযুদ্ধ ও মহামারি কাটিয়ে আসা বিশ্ব অর্থনৈতিক এসব চাপ সামাল দিতে পারেনি।

গ্রেট ডিপ্রেশন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রেসিডেন্ট ফ্র‍্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের নিউ ডিল কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৩৩ সাল থেকে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ছিল ধীরগতির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকারি ব্যয় ও শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে পূর্ণ কর্মসংস্থানের দিকে অগ্রগতি ঘটে। অনেকেই ধারণা করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে বহু দেশের ক্ষতি হলেও আমেরিকা এত লাভবান হয় যে তাদের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ঘটে। এখানে বড় ভূমিকা রেখেছিল অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির ব্যবসা।

আমরা আবার আরেকটা গ্রেট ডিপ্রেশন জাতীয় অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। এরই মধ্যেই বিশ্বজুড়ে কোটির কাছাকাছি মানুষ বেকার হয়েছে, নতুন করে দারিদ্র‍্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ। করোনা মহামারির পর আর্থিক চাপ ও মানবশ্রমের হ্যাসেল কমাতে কর্মী ছাঁটাই করে অনেক প্রতিষ্ঠানই নির্ভরশীল হচ্ছে এআই এর ওপর। আগেরবারের সঙ্গে এবারের অর্থনৈতিক মন্দার ধরণ, আমেরিকা বা বড় শক্তিগুলোর ভূমিকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মিল চোখে পড়তে পারে অনেকের। তবে বড়সড় পার্থক্য আছে একটা, আগেরবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী আফটারম্যাথ হিসেবে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। ফলে দেখা দিয়েছিল অর্থনৈতিক মন্দা। আর এবার আগে মহামারি ঘটার পর আফটারম্যাথ হিসেবে মানবশ্রমের বিকল্প বা এআই-এর আবির্ভাব ঘটেছে। পাশাপাশি হয়েছে ছোট কিন্তু প্রভাবশালী কিছু যুদ্ধও। সামসময়িক সময়কালে হওয়া এই যুদ্ধগুলো ভবিষ্যতে একসঙ্গে একটা টার্ম দিয়েও চিহ্নিত করা হতে পারে।

এবারের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে কি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে? আপনাদের কী মনে হয়?



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ