ছবিঃ সংগৃহীত
গত মাসে সাধারণ মোজার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউনিক্লো, জাপানে যে পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পরিচিত ‘সাশ্রয়ী মূল্যের প্রতীক’ হিসেবে। কিন্তু এরপর ক্রেতাদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় দ্রুতই আগের অবস্থানে ফিরতে বাধ্য হয় তারা। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
তার আগে জনপ্রিয় খাবার ‘মিলানিজ ডোরিয়া’র দাম ২০ ইয়েন (প্রায় ১৩ সেন্ট) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে প্রায় ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে বিবৃতি দিয়েছিল ইতালীয় ধাঁচের পারিবারিক রেস্তোরাঁ চেইন সাইজেরিয়া। দাম না বাড়ানোর জন্য নিজেদের চেষ্টায় যে ঘাটতি ছিল, সে কথাও স্বীকার করে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের নামকরা একটি পোশাক ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠানের এমন খোলামেলা অস্বস্তিতে স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতিতে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাপানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা চাপে আছে। কয়েক দশক ধরে দাম কমতে দেখা দেশটির ক্রেতাদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে একধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে।
টানা ১৩ বছর অত্যন্ত শিথিল মুদ্রানীতি চালানোর পর গত মাসে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অব জাপান) ঘোষণা দেয়, দেশটির মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষ্যে পৌঁছেছে।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে চলে আসা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যহ্রাসের প্রবণতা কাটাতেই ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছিলেন, পরের সরকারগুলোও সে চেষ্টা চালিয়ে যায়।
তবে জাপানে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে ২০২২ সালে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানির সংকট ডেকে আনে। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হওয়ায় জ্বালানির জন্য জাপানকে বিদেশি বাজার থেকে আমদানির ওপর অনেকখানি নির্ভর করতে হয়।
পরে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধাবস্থা আর কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি কমে আসে। এর ধাক্কা লাগে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়, ফলে নানা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও পরিচালন খরচ আরও চড়ে যায়।
বেশিরভাগ দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়তি খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়াতে পারে, কিন্তু জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জটা অন্য রকম, কারণ দেশটির অনেক ক্রেতা এখনো দাম বাড়ানোকে নেতিবাচক চোখে দেখেন। ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হতে পারেন—এই আশঙ্কায় বড়-ছোট সব প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনমতো দাম বাড়াতে দ্বিধা করছে।
গ্রামাঞ্চলের ছোট ব্যবসার বেলায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আরও কঠিন, কারণ তাদের ব্যবসা অনেকটাই দীর্ঘদিনের নিয়মিত ক্রেতাদের ওপর টিকে থাকে।
যেমন জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ওকায়ামা এলাকার রামেন দোকানের ৬৮ বছর বয়সী মালিক সাচি। তাঁর উৎপাদন ও পরিচালন খরচ ক্রমেই বাড়ছে, তবু খাবারের দাম তিনি এখনো বাড়াননি। সম্প্রতি টোকিও সফরের সময় তিনি এএফপিকে বলেন, ‘হঠাৎ করে যদি ২০০ ইয়েন দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিই, তাহলে বছরের পর বছর ধরে যাঁরা আমার দোকানকে সমর্থন দিয়ে আসছেন, তাদের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তাদের কাছে দুঃখিতও মনে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই আমার চিন্তা হলো, আমি নিজেই কষ্ট করে পরিস্থিতি সামলে নেব। আমার ধারণা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীই এভাবে চিন্তা করেন।’
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, সাশ্রয়ী ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি ধরে রাখতেই মোজার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ইউনিক্লো।
আর জনপ্রিয় ডোরিয়াসহ মেন্যুর প্রায় সব খাবারের দাম বাড়ানোর সময় সাইজেরিয়া যে বিবৃতি দেয়, অনেকের চোখে তা ছিল নিজেদের প্রতি অতিরিক্ত কড়া সমালোচনা। এমনকি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ভবিষ্যতে আবার দাম কমানোর সম্ভাব্য সব উপায় খুঁজে দেখার প্রতিশ্রুতি দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অবাক করে।
তবে কয়েকটি পণ্যের দাম আগের জায়গাতেই রেখেছে সাইজেরিয়া, যার মধ্যে আছে প্রতি গ্লাস মাত্র ১০০ ইয়েনের ওয়াইন। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগ এএফপিকে এ বিষয়ে বলে, ‘আমরা চাই মানুষ যেন সহজেই এটি উপভোগ করতে পারেন।’
‘অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে’
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় অন্য পণ্য কেনা বা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার জন্য জাপানের পরিবারগুলোর হাতে আগের চেয়ে কম টাকা থাকছে। এসব খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আবার শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের বাড়তি খরচে চাপে আছে।
অবশ্য দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, টানা আট মাস ধরে জাপানে প্রকৃত মজুরি বছরওয়ারি হিসাবে বেড়ে চলেছে।
টোকিওর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কাজুহিকো সাতো বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তাই এখন আমাকে বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। কারণ, দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম আরও বেশি।’ তিনি যোগ করেন, ‘এ কারণে বাইরে খাওয়াদাওয়াও কমিয়ে দিয়েছি।’
মূল্যস্ফীতি সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাপানে ঋণের সুদহার ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে উঠেছে, সামনে তা আরও বাড়তে পারে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুতোমু ওয়াতানাবে বলেন, ‘মজুরি বৃদ্ধি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া এ সুবিধা সবাই পাচ্ছেন না।’
এএফপিকে তিনি জানান, জি-৭-এর অন্য দেশগুলোতেও মূল্যস্ফীতি জাপানের সমান বা তার চেয়ে বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলোতে মজুরিও তুলনামূলকভাবে ভালোই বেড়েছে, তাই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও খরচ করার প্রবণতা খুব একটা দুর্বল হয়নি।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের মূল পার্থক্য এখানেই—দেশটির অর্থনীতি কয়েক দশকের মূল্যহ্রাসের ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, জাপানে দাম ঠিক করার সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এখনো সবচেয়ে বড় বিবেচনা ক্রেতাদের মনোভাব।
ওয়াতানাবের ধারণা, মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা বলে মেনে নেওয়ার মানসিকতা জাপানের ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হতে আরও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘টানা ৩০ বছর মূল্যহ্রাসের পরিস্থিতিতে থাকার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় প্রয়োজন।’