পেশায় আইনজীবী হলেও গত চার দশক ধরে আম চাষকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন। ছবি: ইউএনবি
পেশায় আইনজীবী হলেও হৃদয়ে তিনি কৃষক। আদালতের ব্যস্ততার পাশাপাশি গত চার দশক ধরে আম চাষকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা সদরের দেবনগর মৌজায় গড়ে তোলা তার ‘ম্যাংগো হ্যাভেন’ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘আমের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবেই পরিচিত।
পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমি ও নিজস্বভাবে কেনা জমি মিলিয়ে প্রায় ৩৯ বিঘা এলাকায় বিস্তৃত এই বাগানে রয়েছে বসতবাড়ি, পুকুর, বাঁশবাগান এবং ১ হাজার ২০০ ফলন্ত আমগাছ। এ বছর প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে। হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, মল্লিকা, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগো ও কাটিমন জাতের আমে ভরে উঠেছে বাগান।
শাহাদাত হোসেনের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া ও স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি বজায় থাকলে এ বছর বাগান থেকে প্রায় এক হাজার মণ আম উৎপাদন হবে। এতে বিক্রি হতে পারে প্রায় ২০ লাখ টাকার আম।
এই আইনজীবী জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। এসএসসি পাসের পর পৈত্রিক জমিতে গাছ লাগানো শুরু করেন। পরে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর আম চাষে আরও মনোযোগী হন।
তিনি বলেন, ‘পুষ্টিকর ও উন্নতমানের আমের আঁটি সংগ্রহ করে চারা তৈরি করতাম। পরে সেগুলো থেকে কাটিং করে গাছ রোপণ শুরু করি। গত ৪০ বছরে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি আমগাছ লাগিয়েছি। এ বছর সব গাছেই আম ধরেছে।’
কৃষিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রপতি পদক এবং ২০১১ সালে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রী পদক লাভ করেন।
তার বাগানে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের দুটি গাছ রয়েছে যেগুলো প্রায় ৬০ বছর বয়সী। এই দুটি গাছ থেকেই প্রতিবছর প্রায় ২০ মণ আম উৎপাদন হয় বলে জানান তিনি।
শাহাদাত হোসেনের ভাষায়, ‘এবার আমের পিক আওয়ার। গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলন হয়েছে। গাছগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলনও বেড়েছে।’
তিনি দাবি করেন, খুলনা অঞ্চলের আমের স্বাদ ও মিষ্টতার ঘনত্ব দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। বিশেষ করে এখানকার হিমসাগর আম অত্যন্ত সুমিষ্ট।
তার বাগানের আরেকটি বিশেষত্ব হলো সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে আম উৎপাদন। তিনি জানান, রাসায়নিক নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গাছের পরিচর্যা করা হয় সেখানে।
‘পশুপাখি যখন আম খেতে শুরু করে, তখন বুঝতে পারি ফল পরিপক্ব হয়েছে। সাধারণত প্রায় ১০ শতাংশ আম পশুপাখি খাওয়ার পর আমরা আম সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু করি,’ বলেন তিনি।
শাহাদাত হোসেন জানান, আইন পেশার পাশাপাশি এখন আম চাষই তার প্রধান ব্যস্ততা। তার বিশ্বাস, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চার মাধ্যমে তরুণদের কৃষির প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।
দিঘলিয়ার এই ‘ম্যাংগো হ্যাভেন’ তাই শুধু একটি বাগান নয়, বরং একজন মানুষের চার দশকের শ্রম, ভালোবাসা ও অধ্যবসায়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।