এলডিসি উত্তরণ (প্রতীকী ছবি)
বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা এসেছে জাতিসংঘ থেকে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে। এর ফলে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মঙ্গলবার (২ জুন) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সিডিপির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে পাঠানো এক বার্তায় জানিয়েছেন, কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করা যুক্তিসঙ্গত হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অতিরিক্ত সময় দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং রফতানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির খবর। কারণ এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিশেষ সহায়তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কেন সময় বাড়ানোর আবেদন?
বাংলাদেশ মূলত ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের কথা ছিল। তবে গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একের পর এক সংকট দেখা দেয়। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চাপের মুখে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সিডিপির কাছে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়। পরে ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছেও এ বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করে চিঠি পাঠান। সরকারের যুক্তি ছিল, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অর্থনীতি ও বাণিজ্য কাঠামোকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
উত্তরণের সব শর্তেই এগিয়ে বাংলাদেশ
সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হলো—দেশটি এলডিসি উত্তরণের তিনটি প্রধান সূচকেই নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করেছে। এই তিন সূচক হলো—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক। কমিটির মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এই সূচকগুলোর ক্ষেত্রে এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে নিকট বা মধ্যমেয়াদে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি খুবই কম। অর্থাৎ বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে জাতিসংঘের কোনও সন্দেহ নেই। প্রশ্ন কেবল উত্তরণের সময়কাল ও প্রস্তুতির বিষয়টি নিয়ে।
কোন কোন ঝুঁকির কথা বলেছে সিডিপি?
যদিও বাংলাদেশের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে সিডিপি, তবে তারা কয়েকটি বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। কমিটির মতে—মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। এসব বিষয় বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক ধাক্কার প্রভাব তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়।
এলডিসি থেকে বের হলে কী হারাবে বাংলাদেশ?
বর্তমানে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কিছু বিশেষ সুবিধা, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ, আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারিগরি সহায়তা, এলডিসি উত্তরণের পর এসব সুবিধার অনেকগুলো ধীরে ধীরে কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।