অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে লণ্ডভণ্ড হাওরাঞ্চল
১১০০ কোটি টাকার ফসলহানি, চরম সংকটে পৌনে ৩ লাখ কৃষক
এ জেড আল মুজাহিদ, কিশোরগঞ্জ: গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর জেলাগুলোতে প্রকৃতির নির্মম আঘাত নেমে এসেছে। টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ। কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ৭টি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বোরো ফসল এখন পানির নিচে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের কৃষকদের সারা বছরের স্বপ্ন ও একমাত্র অবলম্বন বোরো ধান পুরোপুরি ঘরে তোলার আগেই নষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে এখন শুধুই হাহাকার।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে দেশের হাওরাঞ্চলে মোট ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে ৫২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, যা মোট আবাদী জমির ১১.৫৫ শতাংশ।
এই বিপুল পরিমাণ জমি তলিয়ে যাওয়ায় চালের উৎপাদনে বড় ধরণের ধস নেমেছে। সরকারি হিসাব মতে, এবার বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত চালের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন, যার ফলে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০০ কোটি ২৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। আকস্মিক এই দুর্যোগে হাওরাঞ্চলের মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৯০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪,৭৩৯ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে সুনামগঞ্জে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩,৭৬৬ হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জে। এছাড়া নেত্রকোণায় ১০,৭২৭ হেক্টর, হবিগঞ্জে ৯,৬৮৫ হেক্টর এবং মৌলভীবাজারে ২,৭৬১ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি হলেও সিলেটে ৫৯০ হেক্টর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩০৭ হেক্টর জমির ফসল এই পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। পাকা ধানের সোনালী দোলায় কৃষকের বুক আশা বাঁধলেও, ফসল কাটার ঠিক আগমুহূর্তে আকস্মিক ঢল সব স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।
হাকালুকি হাওরের কৃষকেরা জানান, বোরো ধানই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল। এবার তারা কোনো ফসলই ঘরে তুলতে পারেননি। সুনামগঞ্জের একজন প্রান্তিক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, তার ৭ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র ৩ কিয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছিলেন, বাকি ৪ কিয়ার জমির ধান পানির নিচে পচে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। অষ্টগ্রামের কৃষকদের কণ্ঠেও একই করুণ সুর। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা, যাঁরা এনজিও, স্থানীয় সমিতি কিংবা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফসল হারিয়ে এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা জানান, কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত ৪৩ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের মধ্যে ২৯ হাজার ৪৭৩ জনের প্রণোদনা ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। অনুমোদিত প্রত্যেক কৃষককে ১৫ কেজি চাল ও নগদ ৩,০০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘব করতে সরকার আগামী তিন মাস খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মানবিক সহায়তার আওতায় মোট ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৪৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে প্রতি মাসে ১৫ কেজি হারে চাল বিতরণ করা হবে, যার ফলে মোট চালের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭,৩৩২.১৫ মেট্রিক টন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত এই চালের মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪,৮৮৮.৫ মেট্রিক টন এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অবশিষ্ট ২,৪৪৪.২৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হবে। এছাড়া চালের পাশাপাশি দুর্গতদের জন্য নগদ অর্থও প্রদান করা হবে, যার জন্য মোট ১৪৬ কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি জাতীয় পর্যায়ে কোনো খাদ্য সংকট তৈরি করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ও সরকারি কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন চালের ক্ষতি হলেও এর কারণে জাতীয়ভাবে বড় কোনো খাদ্য সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
তবে ভবিষ্যতে এই ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হাত থেকে বাঁচতে কৃষি বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা জানান, আগামী বোরো মৌসুম থেকে হাওরাঞ্চলে এমন জাতের ধান চাষ করা উচিত যা 'আগাম' পাকে এবং ঢল আসার আগেই দ্রুত ঘরে তোলা সম্ভব হয়। জাত পরিবর্তন ও সঠিক পরিকল্পনাই আগামী দিনে হাওরের কৃষকদের এই ধরণের আকস্মিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারে।
কমেন্ট বক্স