নাটোর জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক সময় নেওয়া হয়েছিল উচ্চাভিলাষী এক উদ্যোগ। লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত মানবিক—অল্প খরচে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো। কিন্তু ১ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা ৫২টি ব্যাটারিচালিত (Battery-operated) অ্যাম্বুলেন্স এখন কেবলই এক ব্যর্থ প্রকল্পের দলিলে পরিণত হয়েছে। গত ৮ বছর ধরে অযত্ন আর চূড়ান্ত প্রশাসনিক অবহেলায় এগুলো ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় নষ্ট হচ্ছে, আর এর চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্বপ্ন ছিল স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে কোটি টাকার অপচয় ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ থেকে নাটোরের ৭টি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেনা হয়। প্রতিটি গাড়ির পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছিল ২ লাখ টাকা। শুরুতে এই ‘Project’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছিল। গ্রাম পুলিশের সহায়তায় রোগীরা স্বল্প খরচে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারতেন। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, চালুর মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই নিম্নমানের ব্যাটারি ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গাড়িগুলো একে একে অচল হতে শুরু করে।
৬ মাসের ‘সুখ’ বনাম ৮ বছরের ‘দুর্ভোগ’ সদর উপজেলার ছাতনী ও কাফুরিয়া ইউনিয়নসহ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। কোটি টাকা মূল্যের এই সম্পদগুলো এখন ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় কিংবা খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে মরচে ধরছে। ছাতনী ইউনিয়নের পণ্ডিত গ্রামের বাসিন্দা রফিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে রাতে কেউ অসুস্থ হলে এই অ্যাম্বুলেন্স ছিল গরিবের একমাত্র ভরসা। গ্রাম পুলিশকে ফোন করলেই তারা চলে আসত। এখন সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের প্রাইভেট মাইক্রোবাস বা সিএনজি ভাড়া করতে গিয়ে গুণতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি টাকা।’ একই সুর শোনা গেল দিয়ার গ্রামের ওলিমুদ্দিন পাটোয়ারীর কণ্ঠেও। তার মতে, স্রেফ সঠিক তদারকি বা ‘Maintenance’-এর অভাবেই মূলত গরিবের এই বাহনটি আজ আবর্জনায় পরিণত হয়েছে।
বাজেটের অভাব নাকি সদিচ্ছার ঘাটতি? অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেন মেরামত করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে বেরিয়ে এসেছে ‘Budgetary’ সীমাবদ্ধতার কথা। কাফুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, বর্তমানে একটি বিকল অ্যাম্বুলেন্স সচল করতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা প্রয়োজন। এছাড়া প্রতি বছর ব্যাটারি পাল্টাতে খরচ হবে আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে এই বিশাল ‘Operating Cost’ বা ব্যয়ভার বহন করা প্রায় অসম্ভব।
অন্যদিকে, প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও স্পষ্ট। ছাতনী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘টিআর (TR) প্রকল্প থেকে অ্যাম্বুলেন্সগুলো দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। ফলে এগুলো এখন ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি অকেজো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
দায় এড়ানোর চিরাচরিত সংস্কৃতি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অপচয় চললেও দায় নিতে নারাজ বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম শাহ আলম মোল্লা এবং জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এ বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের দাবি, এই প্রকল্পগুলো তাদের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, জনগণের করের টাকায় কেনা সম্পদ এভাবে নষ্ট হওয়ার দায় কি কেবল সময়ের দোহাই দিয়ে এড়ানো সম্ভব?
নাটোরের এই ৫২টি অ্যাম্বুলেন্স আজ কেবল বিকল গাড়ি নয়, বরং এটি আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের দূরদর্শিতার অভাব এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ‘Systemic Failure’-এর এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।