পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ গণযাত্রাÑ ঈদযাত্রা। সরকারি চাকরিজীবীদের শেষ কর্মদিবস ছিল গতকাল সোমবার (১৬ মার্চ)। আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি। ফলে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে গ্রামের পথে নামতে শুরু করেছেন লাখো মানুষ। নাড়ির টানে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটছেন তারা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শবে কদরের ছুটি আজ ১৭ মার্চ এবং ঈদ উপলক্ষে ১৮ মার্চ অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে পূর্বঘোষিত ছুটি মিলিয়ে ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিন বন্ধ থাকবে সব সরকারি অফিস-আদালত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, এ সময়ে দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই কার্যক্রম বন্ধ রাখবে। তবে হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসা সেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ও পরিচ্ছন্নতা সেবার মতো জরুরি খাতগুলো ছুটির আওতার বাইরে থাকবে।
এদিকে ছুটি শুরুর আগের দিন রাজধানীর সরকারি অফিসগুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন এক আবহ। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শেষ মুহূর্তের কাজ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। অনেক জায়গায় সহকর্মীদের মধ্যে আগাম ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “ঈদের আগে অফিসে কাজের চাপ একটু বেশি থাকে। সবাই চেষ্টা করেন জরুরি ফাইলগুলো শেষ করে ছুটিতে যেতে।”
ঈদের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২১ মার্চ নির্ধারণ করা হলেও তা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করছে। সম্ভাব্য এই তারিখ ধরে আগেই ছুটির সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি ছুটি আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হলেও রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন অনেক মানুষ আগেভাগেই। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে দেখা গেছে ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড়। অনেকেই সম্ভাব্য যানজট এড়াতে আগে থেকেই বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন।
ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও দেখা গেছে যানবাহনের চাপ। বিশেষ করে টঙ্গী, কলেজ গেট, গাজীপুরা ও চান্দনা চৌরাস্তায় কিছু সময় যানবাহন ধীরগতিতে চলতে দেখা গেছে। সড়কে যাত্রী ওঠানামা এবং গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে কয়েকটি পয়েন্টে সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ধাপে ধাপে ছুটি পোশাক কারখানায়:- ঈদযাত্রার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকেন পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা। দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে যানজট এড়াতে এবার পোশাক কারখানাগুলোতে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকেল থেকে অনেক কারখানা ছুটি দেবে এবং পর্যায়ক্রমে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ছুটি চলবে। এর ফলে শ্রমিকরা একসঙ্গে রওনা না হয়ে কয়েকদিন ধরে নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে পারবেন। এতে সড়কে অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং ভোগান্তিও কমবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
ট্রেনে যাত্রীর উপচে পড়া ভিড়:- ঈদযাত্রায় বরাবরের মতো ট্রেন অন্যতম জনপ্রিয় পরিবহন মাধ্যম। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ইতিমধ্যেই ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। অনেকে ভিড় এড়াতে নির্ধারিত সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে এবারও শতভাগ অগ্রিম টিকিট অনলাইনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে আন্তঃনগর ট্রেনের সাত দিনের অগ্রিম টিকিট বিশেষ ব্যবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছে। সোমবার বিক্রি হচ্ছে ২৬ মার্চের ট্রেনের টিকিট।
রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একজন যাত্রী একবারে সর্বোচ্চ চারটি আসনের টিকিট কিনতে পারবেন এবং ঈদযাত্রার টিকিট ফেরত দেওয়া যাবে না। এছাড়া নন-এসি কোচের ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা যাবে।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কয়েকটি ট্রেন সাময়িকভাবে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে না থামার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ভোগান্তির শঙ্কা:- দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে এবার ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঘাট সংকট, ফেরির স্বল্পতা এবং সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যাত্রী ও যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দৌলতদিয়া ঘাটে সাতটি ফেরিঘাটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র তিনটি। নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় পন্টুন থেকে সংযোগ সড়ক অনেকটা খাড়া হয়ে গেছে। এতে যানবাহন ওঠানামা করতে সময় লাগছে বেশি এবং মাঝে মাঝে গাড়ি আটকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদের সময় ঘাটের একটি অংশ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তবে ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদের সময় যাত্রী ও যানবাহন পারাপার নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে বাড়তি চাপ:- ঈদের সময় উত্তরাঞ্চলের প্রধান সড়ক ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কেও যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে এলেঙ্গা, গোলচত্বর, টোলপ্লাজা ও যমুনা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই লেনের সড়কে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ, টোল আদায়ে ধীরগতি, নির্মাণকাজ, বিকল যানবাহন এবং মোটরসাইকেলের বাড়তি চলাচল—এসব কারণে যানজটের সৃষ্টি হতে পারে।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ, র্যাব, হাইওয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নেমেছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাত্রা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সব ভোগান্তি ও শঙ্কার মাঝেও ঈদ মানেই আনন্দ। দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত মানুষ।
রাজধানী ছাড়তে থাকা এক যাত্রী বলেন, “সারা বছর কাজ করি। ঈদে কয়েকদিন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
এভাবেই নাড়ির টানে লাখো মানুষের যাত্রায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ। সব প্রস্তুতি সফল হলে এবারও আশা করা হচ্ছে—কিছুটা কষ্ট থাকলেও প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর আনন্দেই ভুলে যাবেন মানুষ ঈদযাত্রার সব ক্লান্তি।