পাকিস্তান সুপার লিগের (PSL) এবারের আসরে চিরচেনা গ্যালারিভর্তি উন্মাদনা আর দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার শোনা যাবে না। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট তীব্র তেল সংকটের (Oil Crisis) কারণে এবারের টুর্নামেন্ট দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB)। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্টের পরিধিও কমিয়ে আনা হয়েছে; ছয়টি শহরের পরিবর্তে খেলা হবে কেবল লাহোর ও করাচির দুই ভেন্যুতে।
নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর পিসিবি
পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভী এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বর্তমান সংকটময় মুহূর্ত এবং নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তবে তা হবে দর্শকহীন মাঠে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এবারের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও (Opening Ceremony) বাতিল করা হয়েছে।”
পিসিবি প্রধান আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যদি আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয় এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবে টুর্নামেন্টের শেষ ভাগে সীমিত পরিসরে দর্শক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে আপাতত নিস্তব্ধ গ্যালারিতেই লড়বেন ক্রিকেটাররা।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ও ক্রিকেট
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে পাকিস্তানে বর্তমানে তীব্র তেল সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান সরকার দেশজুড়ে চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। মহসিন নাকভী জানান, “প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত সীমিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে, চালু হয়েছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ (Work From Home) এবং ঈদের ছুটিও বাড়ানো হয়েছে। এই অবস্থায় প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শককে স্টেডিয়ামে আসার আমন্ত্রণ জানানো জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।”
হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি ম্যাচে গড়ে ৩০ হাজার দর্শক উপস্থিত হলে দেশটিতে তেলের সীমিত সরবরাহের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতো। এই লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ এড়াতেই ‘ক্লোজড-ডোর’ (Closed-door) ম্যাচ আয়োজনের পথ বেছে নিয়েছে পিসিবি।
ভেন্যু সংকোচন ও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ক্ষতিপূরণ
প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী পেশোয়ার ও মুলতানসহ মোট ছয়টি শহরে খেলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দর্শকহীন মাঠে খেলা হওয়ায় আন্তঃশহর যাতায়াত এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ এড়াতে পেশোয়ার ও মুলতানের ভেন্যুগুলো বাতিল করা হয়েছে। ফলে এবারের পুরো আসর লাহোর ও করাচিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
টিকিট বিক্রি না হওয়ায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির (Financial Loss) সম্মুখীন হতে পারে। তবে পিসিবি আশ্বস্ত করেছে যে, বোর্ডের পক্ষ থেকে এই ক্ষতি পূরণ করে দেওয়া হবে। এছাড়া যেসব ক্রিকেট অনুরাগী ইতিমধ্যে অগ্রিম টিকিট কিনেছিলেন, তাদের পুরো অর্থ রিফান্ড (Refund) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ
এবারের পিএসএলে বাংলাদেশের ছয়জন তারকা ক্রিকেটারের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এনওসি (NOC) বা অনাপত্তি পত্র পাওয়ার ওপর তাদের যাত্রা নির্ভর করছে। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিসিবি ও পাকিস্তান বোর্ড প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করছে।
উল্লেখ্য, গত বছরগুলোতে পিএসএল তার জৌলুস ও উৎসবমুখর পরিবেশের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও এবারের আসরটি নিছক ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের চেয়ে ‘সারভাইভাল’ বা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।