দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাটির বুক চিরে ফসল ফলিয়েছেন কেরানীগঞ্জের জয়নাল মিয়া। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি তার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, "এতকাল চাষবাস করলাম, কিন্তু কোনোদিন সরকারি সাহায্য চোখে দেখিনি। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের চেনা লোকরাই সব পায়, আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের খবর কেউ রাখে না।" জয়নাল মিয়ার এই দীর্ঘশ্বাস কেবল একজনের নয়, বরং সারা দেশের কোটি প্রান্তিক কৃষকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। তবে সেই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এবার নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুত ‘কৃষক কার্ড’ (Krishak Card)।
প্রান্তিক চাষির দোরগোড়ায় সরাসরি সুবিধা: কী থাকছে এই কার্ডে? দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সরাসরি সরকারি ভর্তুকি (Subsidy), সহজ শর্তে কৃষি ঋণ (Agricultural Credit), ন্যায্যমূল্যে সার ও বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং আধুনিক সেচ সুবিধা (Irrigation Facility)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কার্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো। আগে সরকারি প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগেই অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের পকেটে চলে যেত। এখন ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।
পহেলা বৈশাখে উদ্বোধন: ৪ বছরে ৬৮১ কোটির মেগা প্ল্যান আগামী পহেলা বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে চার বছর মেয়াদী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৬৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তার একটি গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করবে।
৫টি শ্রেণিতে বিন্যাস ও ডিজিটাল ডেটাবেজ: দুর্নীতির পথ বন্ধের উদ্যোগ এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, কৃষকের আয়, জমির মালিকানা এবং আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তাদের মোট পাঁচটি ক্যাটাগরিতে (Category) ভাগ করা হবে। বর্তমানে দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ (Digital Database) তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে তাদের তথ্য সার্ভারে আপলোড করা হবে, যাতে কোনো ভুয়া আবেদনকারী সুবিধা নিতে না পারে।
খাদ্যে স্বনির্ভরতা ও রফতানির হাতছানি: কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা? কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ কেবল খাদ্যে স্বনির্ভরই হবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি পণ্য রফতানির (Export) সক্ষমতাও অর্জন করবে। প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এ বিষয়ে বলেন, "খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) নিশ্চিত করার জন্য কৃষক কার্ড একটি মাইলফলক হতে পারে। এটি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে এবং সরাসরি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করবে। ফলে কৃষক আরও বেশি ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হবে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় জিডিপিতে (GDP) ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।"
তবে এই বিশাল উদ্যোগের সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এর নিবিড় তদারকি বা মনিটরিংয়ের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় কঠোরতা এবং বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলে ‘কৃষক কার্ড’ হতে পারে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবের গেম চেঞ্জার (Game Changer)। জয়নাল মিয়া বা আব্দুল হাইদের মতো লাখো কৃষকের স্বপ্ন এখন পহেলা বৈশাখের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যখন তাদের হাতে উঠবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই অধিকারের সনদ।