এক দিন পর বিস্তারিত উল্লেখ না করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, তেহরানের সঙ্গে মস্কোর সামরিক সহযোগিতা ‘ভালো’।
আরাগচির কথা থেকে আগের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেরই সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান–সম্পর্কিত স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।
পাশ্চাত্যের সামরিক স্যাটেলাইটের শ্রেষ্ঠত্ব এখন সুস্পষ্ট। বিশেষ করে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেস-এক্স চোরাইপথে আনা স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনালগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া বড় ধরনের যোগাযোগ সমস্যা ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। সে তুলনায় বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না–ও হতে পারে।
রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচি ও সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জানাশোনা আছে এমন একজনের মতে, ইরান যেসব মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের তথ্য পাচ্ছে, সেগুলো সম্ভবত রাশিয়ার একমাত্র সচল নজরদারি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ‘লিয়ানা’ থেকে আসছে।
মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো পাভেল লুজিন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলো এবং অন্যান্য নৌবাহিনীর ওপর নজরদারি চালানো ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে লিয়ানা সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছে।’
নজর এখন আকাশে
ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি এবং তাদের অন্যতম প্রধান স্যাটেলাইট ‘খৈয়াম’ তৈরিতেও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার বাইকনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপণ করা ৬৫০ কেজি ওজনের এই স্যাটেলাইটটি পৃথিবী থেকে ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে ঘুরছে। এটি ভূপৃষ্ঠে থাকা এক মিটার (৩ দশমিক ৩ ফুট) বা তার চেয়ে বড় আকারের বস্তু চিহ্নিত করতে পারে।
লুজিন বলেন, তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে মস্কো ‘ইরানের অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট থেকে তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নিজস্ব বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইটের তথ্য বিনিময় করতে পারে’।
গত বুধবার তেহরান একাধিক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আব্রাহাম লিংকন রণতরিতে আঘাত হানার দাবি করে। তবে পেন্টাগন এই দাবিকে ‘নিছক কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। গত রোববার ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, ভারত মহাসাগরে জ্বালানি নেওয়ার সময় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলায় সেখানে ‘বিশাল অগ্নিকাণ্ড’ ঘটেছে। ওয়াশিংটন এই হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
কয়েক দশক ধরে রাশিয়া ইরানকে শত শত কোটি ডলারের সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ বিমান ও যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং স্নাইপার রাইফেল।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কো আল–জাজিরাকে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া তেহরানকে ‘গোয়েন্দা তথ্য, ডেটা, পরামর্শ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ’ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
মস্কো ও তেহরান তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা জোর গলায় বলে এলেও তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। মস্কো এই সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি।
তবে অস্ত্র সরবরাহ হয়েছে উভয় পক্ষ থেকেই। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকে তেহরান মস্কোকে গোলাবারুদ ও কামানের গোলা, আগ্নেয়াস্ত্র এবং স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
‘কমেটযুক্ত’ শাহেদ ড্রোন
আর এরপরই আছে শাহেদ আত্মঘাতী ড্রোন। ধীরগতির এই ড্রোন কর্কশ শব্দ করে, তবে নির্মাণ খরচ অনেক কম। ইউক্রেনের শহরগুলোতে এগুলো প্রথমে একসঙ্গে কয়েক ডজন এবং পরবর্তী সময়ে কয়েক শ একসঙ্গে ছোড়া হতো।
ইউক্রেন এসব ড্রোন ভূপাতিত করায় এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে সস্তা ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের গণ-উৎপাদন করছে। কিয়েভ এখন উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজস্ব প্রযুক্তিজ্ঞান সরবরাহ করছে। ওই দেশগুলোতে গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়।