অনেক কষ্ট করে ২০ লাখ টাকা দালালকে দিয়েছি, তবু আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় মারা যাওয়া মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার যুবক ইলিয়াস হাওলাদারের বাবা কালাম হাওলাদার।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রায় তিন বছর আগে কাতারে যান ইলিয়াস হাওলাদার। সেখানে এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন।
গত বছরের আগস্টে তিনি কাতার থেকে লিবিয়ায় পৌঁছান। সেখানে একটি বন্দিশালায় আটকে রেখে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় প্রায় ২০ লাখ টাকা আদায় করে। গত সোমবার (২৩ মার্চ) গুরুতর অসুস্থ হয়ে বন্দিশালাতেই তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর চারদিন পর স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে পরিবার বিষয়টি জানতে পারে।
শনিবার ইলিয়াসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বড় ছেলেকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ তার বাবা-মা। স্ত্রী বিথি ও তার দুই বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
মৃত ইলিয়াসের মা রানু বেগম বলেন, আমরা কোনো বিচার চাই না, শুধু আমার ছেলের লাশটা দেশে ফিরে আসুক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত দালাল হাবিব মাস্টার ওরফে হাবিবুর রহমান খন্দকার ডাসার উপজেলার গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মাধ্যমে শতাধিক যুবক বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন বন্দিশালায় আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, একইভাবে নির্যাতনে গত ১৮ মার্চ লিবিয়ার বন্দিশালায় মারা যান ফারুক হাওলাদার। তার পরিবার ২৫ মার্চ এ খবর জানতে পারে।
ফারুকের পরিবার জানায়, তিনি দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। উন্নত জীবনের আশায় চার মাস আগে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় যান। সেখানে তাকে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায় করে। পরে ইতালি নেওয়ার কথা থাকলেও নির্যাতনের এক পর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।
শনিবার ফারুকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা টিনশেড ঘরে তার পরিবার বসবাস করছে। মা মালেকা বেগম, স্ত্রী লাবনী আক্তার এবং দুই সন্তান নিয়ে পরিবারটি অসহায় অবস্থায় রয়েছে।
মালেকা বেগম বলেন, ছেলেটা আর বাঁচল না। ও ছাড়া আমরা কিভাবে বাঁচব?
ফারুকের শাশুড়ি নাজমা বেগম বলেন, দালাল বলেছে লাশ এনে দেবে। লাশ আসার পর আমরা বিচার চাইব।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।