কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনের ফুটবল বিশ্বকাপ এখন নকআউট পর্বে। অর্থাৎ এখন আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই; জিতলেই টিকে থাকা যাবে, হারলেই বিদায়। শুরুতে অনেক আশঙ্কা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বকাপটি সফলই হচ্ছে। শুরুতে অনেক আশঙ্কা ছিল। কিন্তু একের পর এক দল ছিটকে পড়ার এবং প্রতিযোগিতার পরিসর ছোট থাকার মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে, এই বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সফলতার দিকেই এগোচ্ছে।
শুরুর দিকে হতাশার যথেষ্ট কারণ ছিল। টিকিটের দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কিছু শহরে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দেখতেই গড়ে এক হাজার ডলারের বেশি খরচ হচ্ছিল। আর গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম ছিল আরও অনেক বেশি। ফলে খেলা দেখা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। এর পাশাপাশি তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কিছু অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে এমন আচরণ করেছিল, যা সরাসরি অবজ্ঞার শামিল।
ইরানের দলকে প্রতিটি ম্যাচের পর মেক্সিকোতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। সোমালিয়ার শীর্ষ রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বহু সমর্থক ভিসা না পাওয়ায় খেলা দেখতে আসতেই পারেননি।
এর ওপর ছিল ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অতিরঞ্জিত আত্মপ্রদর্শন। যেমনভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের আকাশরেখায় নিজের ছাপ বসিয়েছেন, তেমনভাবেই ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের ওপর নিজের মুখ চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে—দুজনেই অতিরঞ্জনে বিশ্বাসী।
ইনফান্তিনো এই বিশ্বকাপকে ‘মানব–ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ফরাসি বিপ্লব, ওয়াটারলুর যুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে—এসব কিছুই নয়, বরং একটি ফুটবল প্রতিযোগিতাই নাকি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা! তিনি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার জন্যও জোরালো লবি করেছিলেন। তা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই ট্রাম্পকে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেন।
ট্রাম্পের মতো ইনফান্তিনোরও স্বৈরশাসক ও কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। ২০১৮ সালের মস্কো বিশ্বকাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল ছবি সেই প্রবণতারই প্রমাণ। তবে ট্রাম্প যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একবার হোয়াইট হাউসে গিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘আমি এখানে এসে নিজেকে ঘরের মতোই মনে করছি।’ ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, ‘এটাই তোমার ঘর।’ ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়োৎসবে যোগ দিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘আমরা একসঙ্গে শুধু আমেরিকাকেই নয়, গোটা বিশ্বকেই আবার মহান করে তুলব।’
এসব কারণে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এবারের বিশ্বকাপ বুঝি ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর এক প্রহসনে পরিণত হবে। মনে হয়েছিল, ট্রাম্প হয়তো সব আলো নিজের দিকে টেনে নেবেন, অথবা ধনকুবের ও ক্ষমতাধরদের এক উৎসবে পরিণত হবে পুরো আয়োজন, যেখানে একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত শক্তিধরেরা খেলা উপভোগ করবেন, আর অন্যদিকে মার্কিন অভিবাসন দপ্তরের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে বের করে দেবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি।