বাংলাদেশ কি চীনের বলয়ে ঢুকে গেছে?

আপলোড সময় : ২৮-০৭-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৮-০৭-২০২৬


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। সরকারের তরফে বারবারই বলা হচ্ছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করা হবে। অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থার মাঝে দেশে এখন ৯২ শতাংশ বিনিয়োগ চীনের। এছাড়া মেগা প্রকল্পে আরও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি আছে। সরকারও মনে করছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিরাপদ মনে করলেও ঝুঁকি আছে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

চীনের বিনিয়োগ ৯২ শতাংশ 

 

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছানো ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ৩৬৭ মিলিয়ন ডলার বা ৯২ শতাংশই এসেছে চীনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এসব বিনিয়োগ হচ্ছে মূলত উন্নত বস্ত্র, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও নির্মাণসামগ্রী খাতে। বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হংকংভিত্তিক হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রাথমিক ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাড়িয়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সহযোগিতায় এ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে।

 

চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান চায়না লেসো গ্রুপ চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে একটি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে পিভিসি ও পিইএক্স পাইপ, সৌর প্যানেল, স্যানিটারি সামগ্রী, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, দরজা-জানালা, পানি পরিশোধন যন্ত্র, ক্যাবল, আলোকসজ্জা সরঞ্জাম এবং অগ্নিনির্বাপণ পণ্য উৎপাদন করা হবে। এতে নির্মাণসামগ্রীর আমদানি নির্ভরতা কমার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতও উপকৃত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন ও হংকং থেকে বাংলাদেশে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্যের ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি এবং সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।

 

চীনের অর্থায়নে দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি আধুনিক হাসপাতাল, ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং চারটি হেলিকপ্টার যুক্ত হবে স্বাস্থ্যসেবায়। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ১৭টি এমওইউ সই

চীন সফরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনা নেতৃত্বের সম্মতির ভিত্তিতে মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) সই হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের আগ্রহ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উদ্যোগ নিতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জানিয়েছে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এতদিন সর্বাঙ্গীণ কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব পর্যায়ে ছিল। এই সফরের মাধ্যমে সেটিকে উন্নীত করে ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ অ্যা শেয়ার্ড ফিউচার’ বা ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। এটি চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি কূটনৈতিক কাঠামো—যা চীন তার ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

এ ধরনের সম্পর্ক চীনের শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে একই পর্যায়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকে কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি বড় অর্জন বলে মনে করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা বলছেন, মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বড় অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশ একমত হয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), তিনটি চুক্তি, একটি প্রোটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা সই হয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুটি চুক্তি এবং একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। একইসঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে বন্দরভিত্তিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি এবং চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিআইএম) সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কারিগরি সহায়তা দেবে চীন

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যেকোনও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ। প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কিনা, তা নির্ধারণের পরই বাস্তবায়নের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ড্রেজিং এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

এ ছাড়া ব্রিকস, এসসিও এবং আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রচেষ্টায় চীন পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :